logo
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২ ০০:০০
ম্যাচের সঙ্গে মনও জিততে হয় ব্রাজিলকে
সুদীপ্ত আনন্দ, কাতার থেকে

ম্যাচের সঙ্গে মনও জিততে হয় ব্রাজিলকে

কাতার বিশ্বকাপে ঘুচবে লাতিন দলগুলোর আক্ষেপ। কুড়ি বছরের অপেক্ষা শেষে হয় ব্রাজিল, নয়তো আর্জেন্টিনা জিতে নেবে মর্যাদার ট্রফি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছিল। হবেই না কেন? বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি বিশ্বকাপে এসেছে ফর্মের তুঙ্গে থেকে। তবে মরুর বিশ্বকাপ শুরুতেই সেই ভাবনাটা টলিয়ে দিয়েছে মঙ্গলবার দুর্বল সৌদি আরবের কাছে মেসির আর্জেন্টিনা হেরে বসায়। তবে কি এই বিশ্বকাপও মুখ ফিরিয়ে নেবে নান্দনিক ফুটবলের জনকদের কাছ থেকে? ব্রাজিলের কোচ তিতে অবশ্য অভয় দিচ্ছেন। আর্জেন্টিনার মতো তার দলকে অঘটনের শিকার হতে দেবেন না। যাদের হারিয়ে গেল বিশ্বকাপে সেরা ষোলোর টিকিট মিলেছিল, সেই সার্বিয়াকে আজ সামনে পাচ্ছে ব্রাজিল। তাদের হারিয়েই নেইমাররা শুরু করতে চান ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের মিশন। তিতেও দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি সব ধরনের চাপ জয় করে তার দল খেলবে ভয়ডরহীন ফুটবল।

বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থক তো বিশ্বের সবচেয়ে সফল দলটির কোচের কাছ থেকে এমন কিছুই শুনতে চাইবে। কুড়ি বছর হয়ে গেল বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার সুযোগ মিলছে না। ২০০২ সালে জেতা পঞ্চম শিরোপাটি এসেছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মাটি থেকে। চারটি আসর শেষে ফের এশিয়ায় ফিরেছে বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের শিরোপাভাগ্যও কি ফিরিয়ে দেবে এশিয়া?

সময়ই দেবে সে উত্তর। তবে কাল থিয়াগো সিলভাকে পাশে বসিয়ে যেভাবে সংবাদমাধ্যমকে সামলালেন তিতে, তাতে ব্রাজিল কতটা মুখিয়ে, তার একটা ধারণা মিলেছে। এই ব্রাজিল ভীষণ আক্রমণাত্মক। সময়ের সেরা সব ফরোয়ার্ড জড়ো হয়েছে তিতের ছায়াতলে। এবং অবশ্যই নেইমার দিচ্ছেন তাদের নেতৃত্ব। কাকে রেখে কাকে খেলাবেন তিতে এ নিয়ে চলছে গবেষণা। একাদশটা রহস্যঘেরাই রেখেই দিলেন ৬১ বছরের কোচ। ব্রাজিলের প্রায় ২০০ সাংবাদিক বারবার প্রত্যাশার চাপ নিয়ে প্রশ্ন করে গেলেন কোচকে। তিতেও সামলেছেন দারুণভাবে, ‘ফুটবলে ব্রাজিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সবচেয়ে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটা দলের ওপর চাপ থাকে। সেটা আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া। এটাই সহজাত। আর বিশ্বকাপ জিততে আসা একটি দল সবসময়ই চাপটাকে নেমন্তন্ন দিয়ে নিয়ে আসে।’

সেই কবে পঞ্চম শিরোপার স্বাদ মিলেছিল। কুড়ি বছর আগে। ব্রাজিলের একটা প্রজন্ম জানে না বিশ্বকাপের উৎসবের রংটা কেমন। চার বছর আগে রাশিয়াতেও হতাশা গ্রাস করেছে ব্রাজিলকে। সেবারও দলের দায়িত্বে ছিলেন তিতে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে স্বপ্নের সমাধি ঘটে। তবে গত দুই দশকে ব্রাজিল কেন সেরা হতে পারেনি, তার দায় নিতে রাজি নন তিতে। বরং আগেরবার না পারার ব্যাখ্যার পাশাপাশি এবার কেন পারা উচিত, সেটা বলেছেন কৌশলী কোচ, ‘২০১৮ বিশ্বকাপের আগে আমরা মাত্র দুই বছর সময় পেয়েছিলাম দলটাকে গোছানোর। একটা দলকে বিশ্বকাপ জয়ের মতো করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সময়টা বড্ড কম। তবে এবারের সঙ্গে আগেরটা মেলানো যাবে না। দলটাকে ঠিক নিজের মতো করে গড়তে আমি যথেষ্ট সময় পেয়েছি। তাই আজকের অনুভূতিটা চার বছর আগের চেয়ে একেবারেই আলাদা। আমি ততটা চাপে নেই, যতটা তখন ছিলাম। কারণ আমি আমার দিক থেকে যতটুকু করার তার সবটুকুই করেছি।’

অন্য অনেকের মতো কাল সংবাদ সম্মেলনে প্রথম একাদশটা ঘোষণা করেননি তিতে। তাতে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের শুরু থেকে খেলা নিয়ে প্রশ্নটা আরও বড় হয়েছে। ২২ বছরের ভিনিসিয়ুস ক্লাবের হয়ে আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। তার গোলেই চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে লিভারপুলকে হারিয়েছিল রিয়াল। গেল মাসে ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে হয়েছেন পঞ্চম। তারপরও কেন যেন তিতের সেরা একাদশে জায়গাটা পাকা হচ্ছে না। তবে স্পেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মার্কার দাবি সার্বিয়ার বিপক্ষে তিতের সেরা একাদশে আছেন ভিনিসিয়ুস। ম্যাচটা তিতে নাকি খেলাবেন ৪-১-৪-১ ফরমেশনে। যদি তাই হয়, তবে চার ডিফেন্ডারের সামনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের একক দায়িত্ব থাকবে ম্যানইউ তারকা কাসেমিরোর ওপর। আগ্রাসী ফরমেশনে আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেবেন দারুণ ছন্দে থাকা নেইমার। গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে নাম্বার নাইন পজিশনে রেখে নেইমারের সঙ্গী হবেন রিচার্লিসন, রাফিনহা ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আর যদি তিতে তার সহজাত রক্ষণাত্মক ভাবনায় (৪-২-৩-১) যান, সেক্ষেত্রে ভিনিসিয়ুসকে আসতে হবে বেঞ্চ থেকে। কাসেমিরোর সঙ্গে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সামলাবেন তরুণ ফ্রেদ। একাদশ খোলাসা না করে তিতে বলেছেন, ‘তিনটি আলাদা আলাদা মডেল নিয়ে আমরা কাজ করেছি। সেগুলো আমরা প্রতিপক্ষ বুঝে ব্যবহার করব। খেলোয়াড়রা এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। কোচ হিসেবে আমাকে প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্বভাব বুঝে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভিনিসিয়ুস অবশ্যই তার ক্লাবের আক্রমণভাগের অন্যতম অস্ত্র। তবে আমার কাছে আরও অনেক অস্ত্র আছে। তাদের সবাইকে প্রস্তুত রাখাই আমার দায়িত্ব।’

শেষ ১৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচে হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়নি ব্রাজিলকে। তাই বলে বিশ্বকাপেও এ ধারা বজায় থাকবে ভাবাটাই মস্ত বড় ভুল। চিরবৈরী আর্জেন্টিনাই তো দু’দিন আগে এই কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হয়েছে। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর তারা হেরেছে সৌদি আরবের মতো দলের কাছে। ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও যে তেমন কিছু অপেক্ষা করছে না, কে বলতে পারে? বিশ্বজুড়ে বাজিকরদের বাজি অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষে। তারা নাকি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছে এবারের শিরোপা জিতবে সেলেসাওরা। বাজিকরদের অনুমান সত্য করতে ব্রাজিলের শুরুটা হতে হবে ভালো। সার্বিয়া অবশ্য সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তাদের কোচ দ্রাগান স্টইকোভিচ তো ব্রাজিলের এক সাংবাদিকের প্রশ্নে উত্তরে জানিয়ে দিলেন, ব্রাজিল যতই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আসুক, তার ছেলেরা ভীত নয়। সেই সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, ব্রাজিলের চার অ্যাটাকার নেইমার, ভিনিসিয়ুস, রাফিনহা ও রিচার্লিসনকে কীভাবে সামলাবে তার দল? সাবেক যুগোসøাভিয়ান কিংবদন্তির হাসতে হাসতে উত্তর, ‘ব্রাজিল চার ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলবে বুঝি? তাহলে তো তোমরা অনেক ভাগ্যবান। আচ্ছা বলতো, সেক্ষেত্রে তোমাদের পেছনে কে খেলবে? আসল কথা হলো, আমরা কাউকেই ভয় পাচ্ছি না। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে সবার প্রতিই থাকছে সম্মান।’

স্টইকোভিচ ব্রাজিলের প্রতি সম্মান দেখালেও এ মুহূর্তে স্রেফ নিজ দলেই মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন, ‘তিন অ্যাটাকার আর নেইমারকে নিয়ে অবশ্যই ওরা ভীষণ শক্তিশালী দল। তবে আমার জন্য  ব্রাজিলের খেলা বা খেলোয়াড় গুরুত্বপূর্ণ নয়। এরচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে সার্বিয়া খেলে। আমরা এখানে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসিনি। তবে এটাও ঠিক সবকিছু চাওয়ার মতোও হবে না। আমার মনে হয় ব্রাজিলকে থামানো অসম্ভব কিছু নয়।’

তিতে ও সার্বিয়ার কোচের চোখে ‘জি’ গ্রুপটা (অপর দুটি দল সুইজারল্যান্ড ও ক্যামেরুন) বড্ড কঠিন। তবে দিন শেষে দুজনই জানেন কী করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। তাই দারুণ একটা ম্যাচের প্রত্যাশা লুসাইল সিটিতে। তবে ব্রাজিল সমর্থকরা মনে রাখবেন, এই মাঠেই দু’দিন আগে ঘটেছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের ঘটনা। সৌদি ঝড়ে ভূপাতিত হয়েছিল ফেভারিট আর্জেন্টিনা।