logo
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২ ০০:০০
দেড় বছরের সাজা স্বীকৃত ১০১ মাদক কারবারির
তুষার তুহিন

দেড় বছরের সাজা স্বীকৃত ১০১ মাদক কারবারির

২০২১ সালের ৮ মার্চ কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের মরিচ্যাবাজার যৌথ চেকপোস্টে ৫ হাজার ৪০০টি ইয়াবাসহ আটক হওয়া রিপন চন্দ্র ভৌমিককে ২২ নভেম্বর যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এর এক দিন পরই গতকাল বুধবার দেশের আলোচিত আত্মসমর্পণকারী আত্মস্বীকৃত ১০১ ইয়াবা কারবারিকে অস্ত্র মামলায় বেকসুর খালাস, দেড় বছরের সাজা এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে একই আদালত। তবে আগের ২১ মাস হাজতবাস থাকায় ওই সাজা আর ভোগ করতে হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশ্লেষকরা। 

গতকাল বেলা পৌনে ২টায় ওই রায় ঘোষণা করেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাঈল।

তবে রায় ঘোষণার আগেই আলোচিত আত্মসমর্পণকারী ১০১ ইয়াবা কারবারির কিছুই হবে না মর্মে ফেইসবুকে ঘোষণা দিয়েছিলেন উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। এ ছাড়া প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেনের বিনিময়ে মাদক ও অস্ত্র মামলায় নামমাত্র সাজা হবে আত্মস্বীকৃত কারবারিদেরএমন আলোচনা ছিল জেলাজুড়ে। পাশাপাশি কারবারিদের সাজা কমাতে ফান্ড সংগ্রহ ও বণ্টনসংক্রান্ত একটি  প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

পুলিশ, আদালত, আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবা, ৩০টি দেশে তৈরি বন্দুক, ৭০ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেন ১০২ জন ইয়াবা কারবারি। ওই ঘটনায় টেকনাফ থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়। ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদ রাসেল নামে কারাগারে থাকা এক আসামি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি ১০১ আসামির বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। শুরু হয় বিচারকাজ। পরে ২১ জনের সাক্ষ্য ও ২ জনের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আজ (গতকাল) তার রায় হলো।

রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী বলেন, মৃত্যুভয় এবং লোভ দেখিয়ে আসামিদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে পুলিশ। বিচারক রায় পাঠের সময় বলেছেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ মামলা দুটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও বিচারক তার রায়ে জানিয়েছেন।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার (তত্ত্বাবধায়ক) মো. শাহ আলম খান বলেন, আত্মসমর্পণের পর প্রতি আসামি এক বছর নয় মাস করে বিনাশ্রমে কারাগারে ছিলেন। আইন অনুযায়ী সাজা থেকে সেটি বাদ যাওয়ার কথা। তবুও রায়ে কী আছে, তা না দেখে কিছু বলা যাবে না। তবে রায়ে যা-ই থাক আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা নিষ্পত্তির স্বার্থে সব আসামিকে কারাগারে আসতে হবে। সেখানে অবস্থানকালে আদালতের রায়ের কপি, জরিমানা সবকিছু উপস্থাপনের পর তারা পূর্ণ মুক্তি পাবেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ‘রায় ঘোষণার সময় ১৭ আসামি কাঠগড়ায় ছিলেন। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে। তবে এজাহার ও চার্জশিটের দুর্বলতার কারণে সাজার পরিমাণ কম হয়েছে। আগে সাজা ভোগের বিষয়টি কী হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে, আইনি বিধানে এটি গণ্য হওয়ার কথা।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, দুটি মামলাই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও সমাজে একটি বাজে বার্তা প্রচার হওয়ার ভয়ে আত্মসমর্পণকৃত আসামিদের প্রতীকী সাজা দিয়েছে আদালত।

এদিকে, মামলার বিচারকাজ শুরুর পর থেকে ইয়াবা কারবারিদের একটি চক্র রায় পক্ষে নিতে বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, সাক্ষী ও সাফাই সাক্ষী ম্যানেজ করার কথা বলে জনপ্রতি কয়েক লাখ টাকা করে প্রায় ৫ কোটি টাকা তুলেছেন এমন আলোচনা জেলাজুড়েই। সেই টাকা নানাভাবে বণ্টন করা হয়েছে বলেও প্রচার রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই আব্দুর শুক্কুরের নেতৃত্বে চক্রটি এসব টাকা তুলেছে। আর ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করেছেন বদির আরেক ভাই আবদুল আমিন। ইতিমধ্যে ওই টাকা বণ্টন করা হয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।

রায়ের পর আত্মসমর্পণকৃত মামলা দুটি প্রধান আসামি সাবেক সংসদ সদস্য বদির ভাই আত্মগোপনে থাকা আব্দুর শুক্কুর তার ফেইসবুক আইডিতে লেখেন, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি যারা জামিন বাতিলের পর পালিয়ে আছে, তাদের ধরতে কাজ করছে পুলিশ। আত্মগোপনে গেলেও শেষ রক্ষা হবে না তাদের।

অভিযোগ আছে, জামিনে এসে অনেকে ফের ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় এলাকার অনেককে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।