শেষ ৫ দিনে মরণ কামড় বিএনপির

এতদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকার পর সেনা মোতায়েনের দিন সমনে রেখে আজ রোববার থেকে মাঠে নামছে বিএনপি। নির্বাচনী প্রচার শেষের পাঁচ দিন মরণ কামড় দিতে চাইছে দলটি। দলটির নেতারা বলেছেন, অন্তত দুই শতাধিক আসনে জোরদার প্রচার চালাবেন তারা। এর মধ্যে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উত্তরাঞ্চল এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগকে। নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ঢাকার একটি ও উত্তরবঙ্গের দুটি আসনে প্রয়োজনে সংঘাতে জড়াতেও দ্বিধা করবে না সরকারবিরোধীরা।  

ঢাকার অন্তত তিনটি আসনে সরেজমিনে ঘুরে বিএনপি প্রার্থীদের মাঠের নামার প্রস্তুতির খবর মিলেছে। এর মধ্যে ঢাকা-৯ আসনে এতদিন ধানের শীষের প্রার্থী আফরোজা আব্বাস গোপনে প্রচার চালালেও গতকাল শনিবার সকালে প্রথম শাহজাহানপুর-খিলগাঁও এলাকায় মিছিল করে। এ সময় পুলিশ মিছিলের পেছনে অবস্থান নেয়। একইভাবে ঢাকা-১১ আসনে ধানের শীষের শামীম আরাকেও গতকালই প্রথম দুপুরে প্রকাশ্যে বড় মিছিল করতে দেখা গেছে। তবে ঢাকা-১০ আসনে গতকালও দেখা যায়নি ধানের শীষের আবদুল মান্নানকে। তিনি নিউ মার্কেট এলাকায় কিছু লিফলেট বিলি করেছেন। এই তিন প্রার্থীই দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তারা আর বসে থাকবেন না। মাঠে নামবেন।

বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাসীনরা বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড় করে ও প্রচারে বাধা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ভোটের মাঠে ভয় ছড়াচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তারা নির্বাচন থেকে বিএনপিকে সরানো বা মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। কিন্তু সেনা মোতায়েন হলে সে পরিস্থিতি আর থাকবে না। পরিবেশ অনুকূলে আসবে। সে সুযোগকে কাজে লাগাতেই সরকারের কৌশলের বিপরীতে এমন শক্ত কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে তারা। এ সময় তারা পোস্টার লাগাবে। মিছিল করবে। সভা-সমাবেশ করবে। প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোর পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের ওপর ক্ষমতাসীনদের নানা ধরনের বাধা ও নির্যাতনের কথাও তুলে ধরবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অব্যাহত ধরপাকড়, ক্ষমতাসীন নেতাকর্মী ও পুলিশের হুমকি-ধমকি, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, ভয়ভীতি দেখানোসহ নানা বাধার মুখে আমরা মাঠে প্রকাশ্যে প্রচার চালাতে পারছি না। তবে ভোটের মাঠ ছাড়িনি। গোপনে নীরবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। এখন প্রয়োজন ভোটের আগের কয়েকটা দিন ভোটের মাঠে শক্তভাবে থেকে মানুষের মধ্যে ভোটের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আমরা মনে করি, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারলে বিএনপির পক্ষে জনরায় ঘটবে। তাই যেকোনো উপায়ে হোক, আমরা এ কয়েকটা দিন মাঠে থাকব। এ জন্য প্রস্তুতিও চূড়ান্ত।’

দলের নেতারা বলছেন, সংসদীয় আসনগুলোতে প্রচার চালানোর জন্য প্রার্থীর অনুকূলে তৃণমূল নেতাদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি করা হয়েছে। এসব কমিটি জোর প্রচার চালাবে। বাধা এলে প্রতিরোধ করবে। তবে পায়ে পা দিয়ে সংঘাতে না জড়াতে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যোগ্য ও পরীক্ষিতদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই যাতে ভোটকেন্দ্র এজেন্টশূন্য না হয়, সেজন্য প্রতি ভোটকেন্দ্রে নির্ধারিত এজেন্টের বিপরীতে তিন গুণ এজেন্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে। দলের লক্ষ্য, ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এক এজেন্টকে বের করে দিলে বিকল্প এজেন্ট যাতে দায়িত্ব পালন করতে পারে।

 নেতারা আরো বলছেন, ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার জন্য কেন্দ্রভিত্তিক প্রায় ৪০ হাজার কমিটি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ কমিটির নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এসব কমিটি বিভিন্ন অনিয়ম ও জালভোট প্রতিরোধসহ ভোট গণনা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র পাহারা দেবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে কমিটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান আরো বলেন, পাহারা কমিটিতে নাম দিতে কেন্দ্র থেকে জেলা ও উপজেলায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশ এলাকা থেকে তালিকা চলে এসেছে। আশা করছি, ২৫-২৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই কমিটির কাজ চূড়ান্ত হবে। তবে কৌশলগত কারণে এখনই কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হবে না। ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে কমিটির তালিকা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। ভোটকেন্দ্র পাহারা কমিটিতে নারী ও সাহসী  নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের আশপাশে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ কমিটিও প্রস্তুত রাখা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের দায়িত্বশীল একজন নেতা জানান, ভোটকেন্দ্রের পাশাপাশি ভোটারদের আসা-যাওয়ার পথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ছক তৈরির জন্য তৃণমূল নেতাদের আগাম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে তারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। এ ব্যাপারে তারা থানা-পুলিশসহ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। এমনকি প্রশাসনের অসহযোগিতার মুখেও ভোটারদের নিরাপত্তা যাতে অটুট রাখা যায়, সে ব্যাপারে তৃণমূল নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে, সব ধরনের বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে তরুণ  ভোটারদের কেন্দ্রে আনার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দল।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষ সরকারের ওপর এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে পারলেই ধানের শীষের জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ তারা দেখছে আমাদের প্রচারে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। তবুও আমরা মাঠে নামব। যা হয় হবে।