পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৮ এএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১০০ দিন ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন অচলাবস্থায়, তখন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। গতকাল বুধবার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এর আগে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই সংঘাত পরিস্থিতি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। যদিও উভয় দেশই কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলার ঘটনায় কুয়েত ও বাহরাইনের স্পষ্ট এবং সরাসরি দায় রয়েছে। কারণ তাদের ভূখণ্ড ও সহায়তা নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান বলছে, ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো হামলা হলে তার জবাব দিতে সব ধরনের উপায় ব্যবহার করা হবে; এমনকি যেকোনো হামলার উৎসকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং অন্তত ৬৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ৭ জনের জরুরি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হামলার পর দেশটির সব বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এই হামলায় বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনও ক্ষতির মুখে পড়ে। হামলার পরপরই জরুরি সেবা ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে ব্যর্থ হয়। আরও কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি। এক বিবৃতিতে কুয়েতের প্রতিরক্ষা বাহিনীও দাবি করেছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘শত্রুর’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘আঞ্চলিক জলপথ দিয়ে বৈধভাবে চলাচলরত বেসামরিক নাবিকদের দিকে’ ইরানের পাঠানো তিনটি আক্রমণাত্মক ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কেশম দ্বীপে ‘ইরানি সামরিক বাহিনীর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন’কে লক্ষ্যস্থল করে সেখানে আঘাত হানা হয় বলে জানিয়েছে সেন্টকম। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থান কেশম দ্বীপের। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরান পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান এই পথটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে রেখেছে।

তবে কুয়েতের প্রতিরক্ষা বাহিনী বিবৃতি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা বার্তায় ওই বিবৃতিকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। দেশটির এই অভিজাত বাহিনী বলেছে, আমাদের কাছে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩টি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের সফলভাবে আঘাত হানার প্রমাণ আছে।

আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে আঘাত হেনেছে এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক আরেকটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে; ধারণা করা হচ্ছে, এতে কুয়েতের কথাই বোঝানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই হেলিকপ্টারগুলো কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছিল কি না, কিংবা প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাক্রমে বিমানবন্দরে পড়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলি খামেনি বেঁচে আছেন এবং তিনি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত মঙ্গলবার সিনেটের ফরেন রিলেশনস কমিটিতে তিনি বলেন, মোজতবাকে জনসমক্ষে দেখা না গেলেও, লিখিত বার্তা এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। রুবিও বলেন, একাধিক নেতার পরিণতি বিবেচনায় এমন পরিস্থিতিতে তার প্রকাশ্যে থাকা খুব একটা নিরাপদ নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত