সাতসকালে মাছের পসরা

পুব আকাশে লালের আভা ফোটার অনেক আগেই সরগরম হয়ে ওঠে কর্ণফুলীতীরের এই এলাকা। মাছ নিয়ে হাঁকডাক, দরদামে জমজমাট থাকে চারপাশ। চট্টগ্রাম নগরীর মেরিনার্স সড়কসংলগ্ন চাক্তাইয়ে গড়ে উঠেছে মাছের বিশাল এ পাইকারি বাজার। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বেশিরভাগ বাজারে সামুদ্রিক মাছও যায় এখান থেকে। মাছ নিয়ে নানা কর্মযজ্ঞ চলা এ জায়গার পরিচয় নামেই ‘ফিশারিঘাট’।

এই বাজারে সামুদ্রিক মাছের বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। এমন কোনো মাছ নেই, যা ফিশারিঘাটে পাওয়া যাবে না। ভোরবেলার ঘুম ছেড়ে তাই ক্রেতারা মাছের সন্ধানে ছুটে আসেন এখানে। নানা রকম পোয়া, লইট্টা, বাগদা-গলদা চিংড়ি, কোরাল, বাটা, লাক্ষ্যা, তাইল্লা, মাইট্টা, শাপলাপাতা, ছুরি, চান্দা, আইড়, বড় কই, বাইলা, যাত্রিক, চাপিলা, ইলিশ, হাঙর, সুরমাসহ আরও বিচিত্র রকম মাছ দেখে মন ভরে ওঠে ক্রেতাদের। এখন যে জায়গায় আড়তসহ মাছের বেচাকেনা চলে, সেটি পরিচিত নতুন ফিশারিঘাট নামে।

ঘুরে দেখা যায়, ফিশিং বোট আর ট্রলার থেকে মাছ নামানো হচ্ছে, এক আড়ত থেকে অন্য আড়তে টুকরি মাথায় নিয়ে ছুটছে কিছু শিশু-কিশোর। ফিশারিঘাটের ভাষায় ওরা ‘সিঙ্গেল ভাঁড়ি’, সংক্ষেপে শুধুই সিঙ্গেল। এসব শিশু-কিশোর মাছের টুকরি বহন করে নিয়ে যায় আশপাশের বাজারে। ওজনভেদে ৩০ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে মাছের এসব টুকরি পৌঁছে যায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গন্তব্যে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারি সারি ট্রাক, কাভার্ডভ্যান থেকে মাছ ওঠানো ও নামানোর ব্যস্ততা কমে যায়। কারণ ফিশারিঘাট মাছবাজার কর্মমুখর থাকে ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত।

এই মাছবাজার ঘিরে গড়ে উঠেছে হরেক রকম পেশা ও ব্যবসা। যেমন : মাছ সংরক্ষণের কোল্ড স্টোরেজ, বরফকল, বরফ টুকরো করার মেশিন, সামুদ্রিক মাছের আঁশ-লেজ-ফুলকা আর লবণ দেওয়া সামুদ্রিক মাছ বিক্রি ইত্যাদি। আছে ভ্রাম্যমাণ দোকান ও খাবারের হোটেল। সব মিলে এখানে জড়িয়ে আছে ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। ব্যবসায়ী সুনীল সওদাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় পাইকারি মাছ বাজারে দৈনিক ৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়।

প্রায় ১৫ হাজার ফিশিং বোট আর কয়েক হাজার ট্রলারে সাগর থেকে ধরা মাছ বিক্রি হয় এই বাজারে। শুধু সাগরের মাছ নয়, এখানে বিক্রি হয় মিঠা পানির মাছও। পাইকারি ব্যবসায়ী রমিজ সওদাগর জানান, সাতক্ষীরার মিঠা পানির মাছ না এলে বাজার জমে না। কারণ চাহিদা অনুযায়ী মাছ কম, শীতকালে সাতক্ষীরার মাছের চাহিদা বেশি।

দেশীয় মিঠা পানির মাছের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য চাহিদা আছে বার্মা আর ভারতের রুই মাছের। মণপ্রতি ৭ হাজার ৮০০ থেকে ৮ হাজার টাকায় বার্মার রুই এবং ৭ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকায় ভারতের রুই মাছ পাওয়া যায়। একেকটি রুই তিন থেকে নয় কেজি পর্যন্ত হয়।