ফিল্ম টিভির ভবিষ্যৎ নেটফ্লিক্সের মতো ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরম। যদিও এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথা রয়েছে। তবেবাস্তবতা হচ্ছে টিভি তার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। আর ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফরমগুলো।অনেকেই বাংলাদেশে ‘নেটফ্লিক্স’-এর সঙ্গে পরিচিত না। জেনে নেওয়া যাক এই নেটফ্লিক্সটা আসলে কী।এই নেটফ্লিক্স নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত একটি অনলাইন টেলিভিশন চ্যানেল হলো নেটফ্লিক্স। একে ইন্টারনেট টিভিও বলা যায়। এটি একটি বিনোদনধর্মী প্রতিষ্ঠান। জনপ্রিয় সব টিভি সিরিয়াল ও চলচ্চিত্রের জন্য সারা পৃথিবীতে দর্শকদের মন জয় করেছে এই টিভি নেটওয়ার্ক। ১৯৯৭ সালে রিড হ্যাস্টিংস এবং মার্ক রেন্ডোল্ফ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন নেটফ্লিক্স। শুরুর দিকে অন্যদের বানানো মুভি এবং সিরিজের লাইব্রেরি হলেও পরে নিজেরাই প্রযোজনায় নামে নেটফ্লিক্স।
ব্লকবাস্টার সাম্রাজ্যের পতন
বর্তমানে ‘নেটফ্লিক্স’ অনলাইন স্ট্রিমিং জগতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। এই প্রতিষ্ঠান সাফ্যল্যের দিক দিয়ে কতটা এগিয়ে রয়েছে সেটা তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিশ্বব্যাপী নেটফ্লিক্সের স্ট্রিমিং গ্রাহক সংখ্যা ১২ কোটি। তবে নেটফ্লিক্স শুরুর পথটা অতটা মসৃণ ছিল না।
১৯৯০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল জনপ্রিয় এক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্লকবাস্টার। ঘরোয়াভাবে সিনেমা দেখার নামই ছিল সে সময় ব্লকবাস্টার। এই প্রতিষ্ঠানটি ডিভিডি ভাড়া দিত। গ্রাহকরা দোকানে এসে ডিভিডি ভাড়া নিয়ে যেত এবং সিনেমা দেখেই ডিভিডি ফেরত দিতে হতো। ব্লকবাস্টার সবসময়ই চাইত গ্রাহকরা সিনেমা দেখে জলদি যেন ডিভিডি ফেরত দিয়ে যায় কারণ এই ডিভিডি তারা আবার অন্য গ্রাহকের কাছে ভাড়া দেবে। যেহেতু তাদের মূল আয়টা ছিল ডিভিডির ভাড়ার মাধ্যমে তাই জলদি ডিভিডি ফেরত পাওয়াটা তাদের জন্য খুব দরকারি ছিল। কিন্তু অনেক সময়ই গ্রাহকরা ডিভিডি ফেরত দিতে দেরি করত। ফলে দেরিতে ডিভিডি ফেরত দেওয়ার জন্য বাড়তি ভাড়া দিতে হতো গ্রাহককে। যেটা অনেক গ্রাহকই পছন্দ করত না।
নেটফ্লিক্সের সহ-আবিষ্কারক রিড হ্যাস্টিংস তাদের মধ্যে একজন। প্রতিবার ডিভিডি ফেরত দিয়ে জরিমানা দিতে দিতে একসময় বিরক্ত হয়েই নতুন কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে তার। সেই প্রেক্ষাপটেই নেটফ্লিক্স আবির্ভূত হয় এক অভিনব আইডিয়া নিয়ে। তারা গ্রাহককে দোকানে যাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিল। ঘরে বসেই ডিভিডি পেয়ে যেতেন গ্রাহকরা। মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে গ্রাহকরা যত খুশি ডিভিডি অর্ডার করতে পারতেন। খুবই নামমাত্র খরচ ও বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সুবিধার জন্য অনেক গ্রাহকই তখন নেটফ্লিক্সের দিকে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে এবং জনপ্রিয় হতে থাকে। পরে মেইলের মাধ্যমেও গ্রাহককে ডিভিডি দেওয়া শুরু করে নেটফ্লিক্স।
২০০০ হাজার সালের দিকে নেটফ্লিক্সকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ব্লকবাস্টারকে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী রিড হ্যাস্টিংস। কিন্তু ব্লকবাস্টারের প্রতিষ্ঠাতা জন এন্টিওকো এই প্রস্তাবে কোনো আগ্রহ দেখাননি।
এরপর ২০০২ সালের দিক থেকে আস্থা সংকটের কারণে গ্রাহক সংখ্যা হারাতে থাকে ব্লকবাস্টার। আর জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যেতে থাকে নেটফ্লিক্স। ধীরে ধীরে ২০০৭ সালে তারা ভিডিও স্ট্রিমিং শুরু করে। দেখতে দেখতে ২০১০ সালের মধ্যে গ্রাহক সংখ্যা ডিভিডি ব্যবহারকারীদের ছাড়িয়ে যায়।
নেটফ্লিক্সের দুই আবিষ্কারক বুঝেছিলেন শুধু ডিভিডি দিয়ে জনপ্রিয়তা বেশি দিন ধরে রাখা যাবে না। সে জন্য তারা ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ইন্টারনেটকেও যুক্ত করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন নেটফ্লিক্সকে ইন্টারনেটের সাহায্যে প্রচার করতে পারলে সব দিক থেকেই লাভবান হওয়া সম্ভব। তবে রাতারাতি এই বিপ্লব আসবে না সেটিও তারা জানতেন।
স্ট্রিমিং সেবা বাড়লেও এখনো নিজেদের ডিভিডি ব্যবসা ধরে রেখেছে নেটফ্লিক্স। যেসব জায়গায় নেটওয়ার্ক খুবই বাজে সেই জায়গাগুলোতে রয়েছে তাদের ডিভিডি গ্রাহক। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ১৭টি ডিভিডি বিতরণ কেন্দ্র রয়েছে।
কার্যক্রম সম্প্রসারণ
প্রথমে ডিভিডি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে চলচ্চিত্রে এবং ছোট পর্দার ধারাবাহিক পরিচালনায় সম্প্রসারিত হয় নেটফ্লিক্সের কার্যক্রম। এর সঙ্গে ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইনে চলচ্চিত্র দেখার ব্যবস্থা করে।
২০১৩ সালে নেটফ্লিক্স কনটেন্ট (নাটক, চলচ্চিত্র, ভিডিও) প্রযোজনা শিল্পে প্রবেশ শুরু করে। তাদের প্রথম পরিচালিত ধারাবাহিক ‘হাউস অব কার্ডস’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। এরপর থেকে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিক উভয় দিকেই ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে নেটফ্লিক্স।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। এটা নিয়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনাও হয়েছে। এর আগের বছর অবশ্য নেটফ্লিক্সের দুটি সিনেমা চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছিল এবং এ ঘটনায় ফরাসি সিনেমা পরিবেশকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ জন্ম দেয়। ২০১৯ সালে কী হয় এখন সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
সবার জন্য উন্মুক্ত নয়
তবে নেটফ্লিক্সের শো চাইলেই দেখা সম্ভব নয়। এর জন্য করতে হয় নিবন্ধন। দিতে হয় মাসিক ফি। নিবন্ধিত গ্রাহকেরা পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় বসে উপভোগ করতে পারেন টিভি শো ও মুভি।
অ্যাকাউন্ট করে মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে উপভোগ করতে পারবেন নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সব টিভি শো ও সিনেমা। একটি অ্যাকাউন্ট দিয়ে একজন গ্রাহক উপভোগ করতে পারবেন বিষয়টি এমন নয়। একটি অ্যাকাউন্ট দিয়ে চার জন ইউজার এটা ব্যবহার করতে পারবেন।
এখানেও রয়েছে একটি মজা। মনে করেন চারজন চার ধরনের সিনেমা দেখতে পছন্দ করে। কেউ রোমান্টিক, কেউ অ্যাকশন আবার কেউ থ্রিলার। নেটফ্লিক্স সবাইকে তার পছন্দ অনুযায়ী সিনেমার সাজেশন দিয়ে যাবে প্রতিনিয়ত।
বাংলাদেশে নেটফ্লিক্স ব্যবহারকারী রোমেল ফেরদৌস জানান, ক্রেডিট বা ডেভিট কার্ড না থাকার কারণে নেটফ্লিক্স অনেকেই দেখতে পারে না। আর সেই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথের স্বল্পতাও নেটফ্লিক্স না দেখার একটি কারণ। ভালো প্রিন্ট দেখতে গেলে প্রায়ই বাফারিং হয়। আমাদের দেশে নেটফ্লিক্সের সার্ভার থাকলে হয়ত এ স্বল্পতা দূর করা সম্ভব।
বিনামূল্যে এক মাস
সাবসক্রিপশন ছাড়াও বিনামূল্যে এক মাস দেখতে পারবেন নেটফ্লিক্স। নতুন সব গ্রাহককে বিনামূল্যে এক মাস সব প্রোগ্রাম দেখার সুযোগ দেয় নেটফ্লিক্স। এই ফ্রি ট্রায়ালের সুবিধা পেতে ক্রেডিট বা ডেভিট কার্ডের সব তথ্য নেটফ্লিক্সকে জানাতে হবে। প্রথম মাসের মধ্যে ট্রায়াল বন্ধ করে দিলে কোনো টাকা দিতে হবে না আর বন্ধ না করলে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হবে। একটি ইমেল আইডি থেকে একবার মাসে এই ট্রায়াল পাবেন।
তাছাড়া মোবাইলে এসব মুভি ও সিরিজ ডাউনলোড করে অফলাইনে দেখতে পারবেন। তার জন্য গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে নেটফ্লিক্স অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে।
ইউটিউব ও নেটফ্লিক্স
ইউটিউবও অনলাইন স্ট্রিমিং সেবা দিয়ে থাকে। নেটফ্লিক্সও তাই। ইউটিউব সবার জন্য উন্মুক্ত। এই সাইটে আছে ভিডিও পর্যালোচনা, মন্তব্য প্রদানসহ নানা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। তাছাড়া নতুন নতুন মুভিও পাওয়া যায় না ইউটিউবে।
নেটফ্লিক্স সবাইকে খুশি করতে চায় না। তারা শুধু তাদের নিবন্ধিত গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে চায়। এই দিক দিয়ে নেটফ্লিক্স অনেক স্মার্ট। এখানে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ঝকঝকে প্রিন্টের ছবি দেখা যাবে। ইন্টারনেট গতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হচ্ছে নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং সাইট।
বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র উৎসব বলা হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবকে। অথচ ২০১৮ সালে এই চলচ্চিত্র উৎসবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল নেটফ্লিক্সের সিনেমাকে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এই সিনেমা