রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে হয়রানিমূলক মামলার ঘটনা দেশে নতুন নয়। এসব মামলায় আসামি করা না-করা নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও পুরনো। সম্প্রতি নির্বাচনকে ঘিরে দেশে স্বল্পতম সময়ে সবচেয়ে বেশি নাশকতার মামলার রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে ধারণক্ষমতার দুই-তিনগুণ বন্দি নিয়ে কারাগারগুলোতে মানবেতর পরিস্থিতিও দেখা গেছে। এখন অভিযোগ উঠেছে, এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামির তালিকায় নাম ঢুকিয়ে আসামি বা তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বাণিজ্যে জড়িয়ে গেছে পুলিশ। দেখা গেছে যে, গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে থাকাকালে সংঘটিত ঘটনায়ও আসামি হয়েছেন কোনো কোনো বন্দি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল বিরোধী দলের নয়, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকরাও এমন আসামি-বাণিজ্যের শিকার হয়েছেন।
হয়রানিমূলক মামলা এবং এমন আসামি-বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশ সদরদপ্তরও অবগত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, নির্বাচনকে ঘিরে কোথাও কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পেয়েছেন তারা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুসারে, পুরনো মামলায় নাম ঢোকানো, চাঁদাবাজি ও অন্যের জমিদখলসহ নানা অভিযোগে গত দুই বছরে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এ সব ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের দুই বছরের এই পরিসংখ্যান থেকে সারা দেশে বছরজুড়ে এমন হয়রানির একটা সাধারণ চিত্র পাওয়া যায়। এ থেকে অনুমান করা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে চলা গ্রেপ্তার ও আসামি বাণিজ্য কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজশে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ এমন হয়রানিমূলক মামলার ঘটনায় জড়িয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কিংবা স্থানীয় বিরোধের জের মেটাতেও এমন মামলার সুযোগ নিয়েছে অনেকে। আবার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রাজনৈতিক মামলার বদলে মাদকের মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ভুক্তভোগীদের স্বজনদের কাছ থেকে। কিন্তু যে পরিস্থিতিতেই কেউ মামলার শিকার হোক না কেন, এসব মামলার আসামিদের পদে পদে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। একবার এমন রাজনৈতিক মামলায় নাম উঠলে তা থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল। গরিব ও সাধারণ মানুষরা এসব মামলায় উকিল ধরে জামিন নিতে, দফায় দফায় হাজিরা দিতে গিয়ে কোর্ট-কাচারির ঘাটে ঘাটে নানা ভোগান্তির শিকার হন। আর কেউ এমন একাধিক মামলার আসামি হলে তো কথাই নেই।
পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের দৌরাত্ম্যে এসব হয়রানিমূলক মামলা-গ্রেপ্তারের কারণে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা তদন্ত ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করে পুরনো মামলায় আসামি করা কিংবা মামলার ভয় দেখিয়ে পুলিশের অর্থ আদায় করার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই এসব হয়রানিমূলক মামলা নিষ্পত্তি করতে পুলিশকেই এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি আইনি সুরক্ষা দিয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের জামিন ও মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের বলিষ্ঠ ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। নতুন সরকার অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে এসব হয়রানিমূলক মামলা নিষ্পত্তি করবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করবে এটাই প্রত্যাশা।