ঢাকায় ভয়ংকর ‘মামা পার্টি’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোমরে শসা বা গাজর রেখে পথচারীদের ছিনতাইয়ের ফাঁদে ফেলছে একটি চক্র। ‘মামা পার্টি’, ‘সালাম পার্টি’ কিংবা ‘চাচা পার্টি’ হিসেবে পরিচিত চক্রটির অপতৎপরতাকে ভয়ংকর মনে করছে পুলিশ। অনেক নিরীহ লোকজন তাদের খপ্পরে পড়লেও প্রতিকার চাইতে তাদের সবাই যাচ্ছে না পুলিশের কাছে। ফলে চক্রটির অপতৎপরতার সঠিক পরিসংখ্যান পাচ্ছে না পুলিশ।

গত বছর ডিসেম্বরে এ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে মতিঝিল থানা পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে এরকম প্রায় ৩০টি চক্র সক্রিয়।

সম্প্রতি ‘মামা পার্টির’ খপ্পরে পড়েন মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আশ্রাফউদ্দিন চৌধুরী। রাত সাড়ে ৮টায় মতিঝিল থেকে শান্তিবাগের বাসায় ফিরতে রিকশা নেন। রিকশাচালক ফকিরাপুল মোড়ে গিয়ে কাকরাইলের দিকে যেতে থাকে। তখন আশ্রাফ রাজারবাগ হয়ে যেতে বলেন। চালক যুক্তি দেখিয়ে বলে, ‘স্যার ওই রাস্তায় যানজট।’ চালক কাকরাইল মোড়ের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। রিকশাটি কাকরাইল মোড়ে পৌঁছার একটু আগেই চালক গতি কমিয়ে দেয়। আশ্রাফকে এক যুবক সালাম দিয়ে বলে, ‘মামা কেমন আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন।’ আশ্রাফ বললেন, ‘না, আপনাকে তো চিনলাম না।’ ওই সময় এক যুবক ‘এই দেখেন’ বলে তার কোমরের সামনের অংশে হাত দেয়। বলে, ‘দেখেন

পিস্তল।’ তারপর আরও চার-পাঁচজন এসে হাজির। সবার চুল ছোট করে কাটা, ব্লেজার পরা দেখে মনে হয় ডিবি পুলিশের লোক।

আশ্রাফকে তারা বলতে থাকে, ‘আপনি নাশকতার মামলার আসামি।’ তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে বলে, ‘আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’ আশ্রাফ ব্যাংকের পরিচয়পত্র দেখালেও কোনো লাভ হয়নি। পরে চক্রটি তার মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোন নিয়ে কেটে পড়ে। যাওয়ার সময় বলে, ‘পেছনে তাকালে গুলি করব।’ তারা চলে যাওয়ার পর আশ্রাফ দেখেন ওই রিকশাচালকও নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস জানান, রাজধানীর মতিঝিল, চকবাজার, শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী, গুলশান, কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ‘মামা পার্টি’ ও ‘সালাম পার্টি’। এসব চক্রের সদস্য রিকশাচালক, কিছু অর্ধশিক্ষিত ও শিক্ষিত তরুণ।

মিশু আরও জানান, তার দিক-নির্দেশনায় কয়েক দিন আগে মতিঝিল থেকে এ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই চক্রের কয়েকজনকে আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাই ও প্রতারণার কাজে নেমে পড়ে তারা।

মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন বলেন, ‘আপনি রিকশায় চড়ে কোথাও যাচ্ছেন। হঠাৎ একজন এসে সালাম দিয়ে আপনাকে বলল, ‘‘মামা, বড়ভাই বা চাচা কেমন আছেন? আমাকে চিনেছেন?” আপনিও হয়তো তাকে পরিচিত মনে করে কথা শুরু করেছেন। ততক্ষণে আরও চার-পাঁচজন এসে রিকশা ঘিরে ধরবে। কোমরে গাজর বা শসা গুঁজে রেখে অস্ত্র আছে বলে আপনাকে ভয় দেখাবে। ডিবি পুলিশ বলেও ভয় দেখাতে পারে। ঘটনার শিকার ব্যক্তি কিছু বুঝে ওঠার আগেই যা আছে সব দিয়ে দিচ্ছে। এভাবে প্রতিদিন সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বহু মানুষ। তাদের বেশ কয়েকটি চক্রকে মতিঝিল ও পল্টন থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’

ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি পল্টনের আইডিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে জিতু (৪৯), মিজান (৩৫), আকতার হোসেন (৪৫), রিপন (২৮) ও পিন্টু মিয়াকে (৩১) গ্রেপ্তার করে ডিবি। ওই ঘটনায় পল্টন থানায় করা মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সালাম পার্টি বা মামা পার্টির সদস্যদের দেখলে বোঝার উপায় থাকে না তারা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। দেখতে ভদ্র ও উচ্চবিত্তের পরিবারের লোকজনের মতো তাদের চলাফেরা। সন্ধ্যার পর তারা রিকশা, মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকার নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। তারা একেক দিন একেক এলাকায় যায়। ব্যাংক বা এটিএম বুথ থেকে বের হওয়া লোকজন, আড়তে বা পাইকারি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ব্যবসায়ী, ভ্যানিটি ব্যাগ ও গয়না পরে থাকা নারী তাদের প্রধান লক্ষ্য।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শিবলী নোমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামা পার্টি, সালাম পার্টি, চাচা পার্টি যাই হোক, এদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশের তৎপরতার কারণে এই পার্টি এখন কোণঠাসা। মতিঝিল এলাকায় তাদের কার্যক্রম তেমন একটা নেই। এদের দ্বারা কেউ হয়রানির শিকার হলে নিকটস্থ থানা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করছি।’