বিদেশ থেকে আমদানি করা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের গুণগত মান নিয়ে সংশয় থাকায় শনিবার সারা দেশে শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের প্যাকেট খোলার পর সেগুলো ঝরঝরে অবস্থায় থাকারই কথা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পুষ্টিসেবা কর্মসূচির জন্য পাঠানো ক্যাপসুলের প্যাকেট খুলে একটির সঙ্গে আরেকটি আঠার মতো জোড়া লাগানো অবস্থায় পাওয়া যায়। বেশ কয়েকটি জেলা থেকে এমন অভিযোগ আসায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। স্থগিত হওয়া ক্যাম্পেইনের আওতায় দেশের দুই কোটি ২০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের জন্য নীল রঙের এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য লাল রঙের ক্যাপসুল সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী প্রায় ২৫ লাখ শিশুর জন্য কেনা ক্যাপসুলগুলোর মান ভালো পাওয়া যায়। কিন্তু এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৯৫ লাখ শিশুর জন্য সরবরাহকৃত ক্যাপসুল নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর পুরো কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, রাতকানা রোগ ছাড়াও ‘এ’ ক্যাপসুলের আরও উপকারিতা রয়েছে। এটা শিশুর দৈহিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং রোগপ্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ায়। এহেন ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা দুঃখজনকই শুধু নয়, উদ্বেগজনকও বটে। এই ওষুধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরকারি ওষুধ বিতরণ ও খাওয়ানোর কর্মসূচিগুলোর প্রতি আস্থা খর্ব হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যে। বিষয়টি অবহেলার নয়। আমাদের ওষুধ খাত ক্রমেই উন্নতি করছে। আমরা বিদেশে ওষুধ রপ্তানি করছি। মানসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেশি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে কি না, তা যাচাই করা উচিত। ১৯৯৪ সাল থেকে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি চালু রয়েছে। সরকারিভাবে নেওয়া এ কর্মসূচিতে বছরে দুবার শিশুদের এই ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। বিশ্বের আর কোনো দেশে এ ধরনের কর্মসূচি নেই, যেখানে একসঙ্গে এত শিশুকে ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। একে সরকারের একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর সুফলও প্রমাণিত। তবে অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে দেখতে পাব যে, তারা ভিটামিনসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণের দিকে ক্রমবর্ধমান হারে ঝুঁকছে। কারণ প্রাকৃতিক খাবারের ভিটামিন শরীরের জন্য বেশি উপকারী ও বেশি কার্যকরী। এ অবস্থায় ভিটামিনসমৃদ্ধ দেশীয় খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের দিকে মানুষকে উৎসাহী করা উচিত।
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে ওষুধ ক্রয়ের দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে একটি অপরিচিত প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পায়। এই কোম্পানির ওষুধের মান নিয়ে তখনই দেশের আন্তর্জাতিক মানের কয়েকটি কোম্পানির আপত্তি সত্ত্বেও তাদের ওষুধ ক্রয় করা হয়। এমনকি ক্রয়কৃত ক্যাপসুলগুলোর কোনো এনওসি (নন অবজেকশন সার্টিফিকেট) ছিল না। তারপরও কী করে শিশুস্বাস্থ্য তথা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এসব ওষুধ ক্রয় করা হলো, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়টির সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাদের ওপর জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের বড় দায়িত্ব, তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ ওঠা একই সঙ্গে উদ্বেগজনক এবং লজ্জাকর।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আমরা আশা করব উভয় তদন্ত কমিটি দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবে এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। প্রত্যাশা থাকবে সরকার সেভাবেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমরা অতীতেও মানহীন ওষুধ খেয়ে শিশুর মৃত্যু দেখেছি। আমরা এর পুনরাবৃত্তি চাই না। কোনোভাবেই যেন মানহীন ভিটামিন ক্যাপসুল বা ওষুধ বাজারে না আসে, সে জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয়তা দেখাতে হবে।