বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক ও বাংলাদেশ

নতুন বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্টের গবেষণা বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বরাবরের মতো বাংলাদেশের গণতন্ত্র সূচক নিয়েও কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া পাড়ায় এ নিয়ে  আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইআইইউর তথ্য মতে, এবার বাংলাদেশ গণতন্ত্র সূচকে গত বছরের তুলনায় ০.১৪ স্কোর বেশি পেয়ে চার ধাপ এগিয়েছে। প্রতিবেদন মতে, ৫ দশমিক ৫৭ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ১৬৫টি দেশের মধ্যে ৮৮তম স্থানে অবস্থান করছে। গত বছর এ স্কোর ছিল ৫ দশমিক ৪৩ এবং দেশের অবস্থান ছিল ৯২তম। এ বছরের সূচকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও শ্রীলঙ্কা ছাড়া আর বাকি দেশগুলোরÑ ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। ইআইইউ ২০১৮ সালে দেশের গণতন্ত্রের পাঁচটি বিষয়ের ওপর নিরীক্ষণ চালিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে গণতন্ত্র চার ধাপ এগিয়েছে বলে জানাচ্ছে। ইআইইউ যে পাঁচটি বিষয়ের ওপর গবেষণা চালিয়েছে, তা হচ্ছেÑ নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকার।

দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার গবেষণা বিভাগ ইআইইউ ২০০৬ সাল থেকে এই জরিপ করে আসছে। ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রতি দুই বছর অন্তর জরিপ করলেও এরপর থেকে প্রতি বছর জরিপ শুরু করে। ইআইইউ জরিপ করা দেশগুলোর শাসনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দেশগুলোকে চারটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। প্রত্যেকটি মানদ-কে ০ থেকে ১০ পর্যন্ত স্কোরের মধ্যে রেখে গড় হিসাব করা হয়। এবং প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে ওপরে উল্লিখিত চারটি ক্যাটাগরির কোনো একটিতে স্থান দেওয়া হয়।  সেই বিবেচনায় ৯ থেকে ১০ স্কোর প্রাপ্ত দেশগুলোতে পূর্ণ গণতন্ত্র, ৭ থেকে ৮ স্কোর প্রাপ্ত দেশগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, ৫ থেকে ৬ স্কোর প্রাপ্ত দেশগুলোতে হাইব্রিড রেজিম এবং ০ থেকে ৪ স্কোর প্রাপ্ত দেশগুলোতে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বিরাজ করছে। এই হিসাব মতে, ২০টি দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র, ৫৫টি দেশে ক্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, ৩৯টি দেশে হাইব্রিড রেজিম এবং ৫৩টি দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বিরাজ করছে।

ইআইইউ-এর ভাষ্যমতে, পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যে দেশে নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষিত থাকবে এবং এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকবে যাতে গণতান্ত্রিক নীতিগুলো বিকাশ পায়, গণতান্ত্রিক অধিকারের পূর্ণ চর্চা থাকে। পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপাদানগুলো হচ্ছেÑ স্বাধীন বিচার বিভাগ, সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য ও পূর্ণ জবাবদিহি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য। ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র হচ্ছেÑ যেখানে কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, শাসকশ্রেণি নাগরিক অধিকারে সম্মান দেখায় ও রক্ষা করে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবিকশিত এবং শাসনব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ। হাইব্রিড রেজিমে নির্বাচন পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকার ফলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। এখানে নির্বাচন হয় লোক দেখানোর জন্য। ক্ষেত্রবিশেষে সুষ্ঠু হলেও রাজনৈতিক দলগুলো ফল নিয়ে সন্তুষ্ট হয় না। সরকারি দল নির্বাচনী ফল অনুকূলে আনার জন্য সব সময় নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা করতলগত করে রাখতে চায়। যার ফলে বিরোধী দলগুলোর ওপর অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন চালায়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই, থাকলেও সীমিত। দেশের সর্বস্তরে ব্যাপক দুর্নীতি বিদ্যমান। শাসকশ্রেণি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নির্যাতন করে এবং সব সময় চাপে রাখে। সমালোচনার বিষয়ে সরকারের সহ্যক্ষমতা কম থাকে। অনেক সময় গণমাধ্যমে ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ আরোপ করে। হাইব্রিড রেজিমে সিভিল সোসাইটিকে দুর্বল করে রাখা হয়। তাদের প্রতি সরকারের রোষ থাকে। শাসকশ্রেণি নাগরিক অধিকারে সম্মান দেখায় না এবং বিভিন্ন অজুহাতে হস্তক্ষেপ করে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো দলীয়করণ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকার কর্র্তৃত্ববাদী আচরণ করে।

 স্বৈরতান্ত্রিক শাসন হচ্ছে যেখানে বহুদলের রাজনীতি অনুপস্থিত। রাষ্ট্র পরিচালনা হয় রাজতান্ত্রিক নিয়মে বা একনায়কের অধীনে। ক্ষেত্রবিশেষে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও তা নামমাত্র। শাসকশ্রেণি কর্র্তৃক দেশের নিরাপত্তার দোহাই বা উন্নয়নের নামে ইচ্ছামতো নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা একটা সাধারণ ব্যাপার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকে না। নির্বাচন হয় না, যদিও বা হয় তা লোক দেখানো মাত্র। গণমাধ্যম থাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে। সরকার সমালোচনা সহ্য করে না।

ইআইইউ-এর শাসনব্যবস্থার বিশ্লেষণের আলোকে বাংলাদেশ হাইব্রিড রেজিম স্তরে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে, গণতন্ত্র সূচকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৬ দশমিক ১১ (ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র)। এই স্কোর ছিল ২০০৬ সালে। ২০০৮ থেকে বাংলাদেশ হাইব্রিড রেজিমের তালিকাভুক্ত হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস গত বছর (২০১৮) ‘ডেমোক্রেসি ইন ক্রাইসিস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন বিবেচনায় বিশ্বের দেশগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। যথাÑ মুক্ত, আংশিক মুক্ত এবং একেবারেই মুক্ত নয়। ফ্রিডম হাউস ১৯৫টি দেশের ওপর এ জরিপ চালিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আংশিক মুক্ত দেশের তালিকায় স্থান দিয়েছিল।

২০১৮ সালের মার্চ মাসে জার্মান-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলম্যান স্টিফটুং’ বিশ্বের ১২৯টি দেশের বাজার অর্থনীতি এবং সুশাসনের অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিষ্ঠানটিও ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সমীক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম। উক্ত প্রতিবেদনে  বলা হয়, ৫৮টি দেশ এখন স্বৈরশাসকের অধীনে। ৭১টি দেশে গণতান্ত্রিক শাসন বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সমীক্ষায় বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া এবং উগান্ডাÑ এই পাঁচটি দেশের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয় যে, দেশগুলোতে এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদ- পর্যন্ত মানা হচ্ছে না। আরও বলা হয়, এসব দেশে বহু বছর ধরে গণতান্ত্রিক শাসন চললেও গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছিল। যদিও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘বেরটেলম্যান স্টিফটুং’-এর প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং রিপোর্টটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণতন্ত্র একটি প্রায়োগিক মতবাদ। কোনো দেশে গণতান্ত্রিক শাসন আছে কি নেই সেটা যাচাইয়ের জন্য গবেষকরা দুটি পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন। প্রথমটি,vertical accountability। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, horizontal accountability। প্রথমোক্ত পদ্ধতির সঙ্গে গণমানুষের প্রতিনিধিত্বের বিষয় জড়িত। প্রতিনিধিত্বশীল পদ্ধতিতে দেখা হয় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলো, নির্বাচনের ত্রুটির ব্যাপারে সমস্যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে বিরাজমান গণতন্ত্রের মান নির্ণয় করা হয়। আরও দেখা হয়, সময় মতো নির্বাচন হচ্ছে কি না, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে কি না, সর্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত হয় কি না, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু, মানুষ নির্বিঘেœ সংগঠিত হতে পারে কি না, নাগরিকরা স্বাধীনভাবে পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারে কি না, সব রাজনৈতিক দল স্বীয় রাজনৈতিক কর্মকা- অবাধে পালন করে করতে পারে কি না ও তাদের রাজনৈতিক ইশতেহার প্রচারে কতটা বাধাহীন, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি না ইত্যাকার বিষয়। যা একটি গণতান্ত্রিক দেশে নতুন সংসদ গঠনের জন্য অপরিহার্য।

এরপর horizontal accountability মানদণ্ড দেখা হয় একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ। এখানে বিবেচ্য বিষয়গুলো হচ্ছেÑ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন কি না, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করে কি না, শাসকশ্রেণির পক্ষ থেকে দলমত-নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রপ্রদত্ত সেবা উপযুক্তভাবে পায় কি না, সকল নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার উন্মুক্ত কি না, শাসকশ্রেণি সামাজিক সমতা ও মানবিক মর্যাদায় গুরুত্ব দেয় কি না, জাতিগতভাবে সকল সংখ্যালঘু শ্রেণির প্রতি সরকার যথোপযুক্ত দায়িত্বশীল কি না ইত্যাকার বিষয়। উল্লিখিত বিষয়গুলো সরকার গঠনের পরে বিবেচ্য। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল গণতান্ত্রিক কি না তা প্রমাণিত হয়। এবং গণতান্ত্রিক শাসন যাচাইয়ের উল্লিখিত পদ্ধতি দুটির আলোকে এটাও প্রমাণিত হয় যে দেশটি গণতান্ত্রিক কি না।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যে মত দিচ্ছে সেটার সত্যতা যাচাইয়ের মানদ- এ দেশের সাধারণ জনগণ। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের যে ধরনের অধিকার পাওয়ার কথা বাংলাদেশের জনগণ তা পাচ্ছে কি না সেটা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চাইতে এ দেশের মানুষ অধিক জ্ঞাত। একটি দেশে গণতান্ত্রিক শাসন আছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য যে সব বিষয় ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে সে মানদ-গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক অবস্থান মূল্যায়নের জন্য আমাদের দেশের জনগণের মতই হচ্ছে চূড়ান্ত। এবং প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে তারা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই হবে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক কি না তার প্রমাণ।
লেখক: সাংবাদিক