সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নাটকের দল। নানা বাধা পেরিয়ে অভিনয় করেন নাট্যকর্মীরা। মহড়া কক্ষও নেই। তারপরও থেমে নেই ‘লুব্ধক থিয়েটার’র নাট্যকর্মীরা। তাদের গল্প শোনাচ্ছেন ইফতেখার ফাগুন
‘সারা বছর ধরে সেমিস্টারভিত্তিক লেখাপড়ার প্রচ- চাপ থাকে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পড়ালেখা শেষে একটু বিনোদন পেতে, সৃজনশীল কাজ করতে মন চায়। সে জন্যই নাটকের দল গড়ে তুলেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বপ্ন তৈরি করে দিতে চাই।’ কথাগুলো আরশাদুল ইসলামের। তিনি সিলেট কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের একমাত্র নাট্য সংগঠন ‘লুব্ধক থিয়েটার’র সভাপতি। তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি শহর থেকে একটু দূরে। টিলাঘেরা ক্যাম্পাস। এখানেই লুব্ধকের জন্ম ২০১৬ সালের নভেম্বরে। তাদের সেøাগান, ‘সমাজকে দেখি, সমাজকে গড়ি।’ সাধারণ সম্পাদক রাফিউ আহমেদ ইরাদ বললেন, ‘নাটকের মাধ্যমে আমরা সমাজের অসংগতিগুলো তুলে ধরতে চাই।’ শুরুতে তাদের সদস্য ছিলেন আটজন। আর এখন আছেন ৫৫ জনেরও বেশি। আরশাদ জানালেন তাদের জন্মের গল্প, ‘নাটকের প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা। তাই বিভিন্ন বিভাগের এই ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাট্যাভিনয় করতাম। এরপর একসঙ্গে হয়ে এটি তৈরি করলাম।’
এই পর্যন্ত বরেণ্য তিন নাট্যকারের তিনটি বিখ্যাত নাটকের মঞ্চায়ন করেছেন তারা। সেগুলো হলো সেলিম আল দীনের ‘বাসন’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘এখনও ক্রীতদাস’ এবং এস এম সোলায়মানের ‘খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’। বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর মঞ্চায়িত হয়েছে ‘বাসন’, ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল একই মিলনায়তনে মঞ্চায়িত হয়েছে ‘এখনও ক্রীতদাস’। সে বছরের বিজয় দিবসে বিশ^বিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে অভিনীত হয়েছে ‘খ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’।
প্রথম নাটক নিয়ে মঞ্চে আসতে ঠিক এক বছর সময় লাগল কেন? সভাপতি আরশাদ বললেন, ‘নাটক প্রযোজনার জন্য প্রয়োজনীয় নাট্যকর্মী, পৃষ্ঠপোষকতা ও মহড়া কক্ষের অভাবে আমাদের নাটক নিয়ে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেল।’ তিনি আরও জানালেন, ‘আমাদের নাটকগুলো মহড়া কক্ষের অভাবে সময়মতো প্রযোজনা করা সম্ভব হয় না এবং সেগুলো আরও রিহার্সাল করা গেলে আরও ভালো হতো।’ কেন নাটক করেনÑ এই প্রশ্নের জবাবে লুব্ধকের অন্যতম কর্মী সাবিহা নাসরীন বললেন, ‘মঞ্চের জোরালো ভাষা আছে। সেটি ব্যবহার করে আমরা এই বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য থেকে শুরু করে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি সবই তুলে ধরি। অভিনয় ভালোবাসি এবং এ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে বলে আমরা আমাদের কথাগুলো নাটকের ভাষায় তুলে ধরি।’ তবে এত দিনেও মাত্র তিনটি প্রযোজনার কারণ অনেক। অনেক সংকট পাড়ি দিয়ে চলতে হচ্ছে লুব্ধককে। সেগুলোর অন্যতম হলো, নিজস্ব কোনো মহড়া কক্ষ নেই থিয়েটারের। কোনোদিন কোনো ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ, কোনোদিন বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন আবার কোনোদিন কোথাও জায়গা না পেয়ে ক্যাম্পাসের খোলা আকাশের নিচে, মাঠে মহড়া দিতে হয় তাদের। তারপরও তাদের নাটকগুলো দর্শকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
নিয়মিত দর্শক মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী নাতাশা তাসনিয়া বললেন, ‘আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ে লুব্ধক খুব জনপ্রিয়। প্রতিটি নাটকেই হলভর্তি দর্শক ছিল। তাদের পরবর্তী প্রযোজনার উন্মুখ হয়ে থাকি।’ নাট্যদলটির সাধারণ সম্পাদক বললেন, ‘চলতি মাসের ৩১ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বাসনের দ্বিতীয় প্রদর্শনী হবে। আমরা সেটি নবীন ছাত্রছাত্রীদের বরণ করতে আয়োজন করছি।’ তিনি বললেন, ‘দুই বছর ধরে আমরা মঞ্চে এবার তোমার শিরোনামে একটি অভিনয়শিল্পী অন্বেষণ প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যারা অভিনয় করতে আগ্রহী তাদের আমরা থিয়েটারের প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসি।’
তিনি আরও বললেন, ‘একক অভিনয়, যৌথ অভিনয়, মূকাভিনয়, বাদ্যযন্ত্র এবং অন্যান্য (আবৃত্তি, নাচ, গান) এই বিভাগগুলোয় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।’ চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি এই প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হবে। সভাপতি বললেন, ‘মৌলিক বিজ্ঞান ও ভাষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহুল ভট্টাচার্য আমাদের খুব সহযোগিতা করেন। তিনি আমাদের উপদেষ্টাও। এ ছাড়া মলিকুলার বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউর রহমান আগে আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন। তিনিও উপদেষ্টা, মহড়ায় থাকেন, দেখিয়ে দেন এবং প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতাও করেন।’
আলাপের শেষ দিকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শ্রদ্ধার সঙ্গে অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় বিশ^াসের কথা স্মরণ করলেন। বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক এই প্রক্টরই ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে থিয়েটারটি প্রতিষ্ঠা করেন।