ফুটবলের আগের জৌলুস এখন আর নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাবি খেতে খেতে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে এ দেশের ফুটবল। গত ১৫ বছরে আন্তর্জাতিক সাফল্য নেই বললেই চলে। তারপরও এই পিছিয়ে পড়া ফুটবলকেই বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন কিছু ফুটবলপাগল মানুষ। আর তাদের কারণেই এখনো ঘরোয়া পর্যায়ে হালের বিপিএল টি-টোয়েন্টি পরেই বিপুল অর্থের ছড়াছড়ি ফুটবলে। বলা হচ্ছে ঢাকার ক্লাবগুলোর কথা। এরাই মৃতপ্রায় ফুটবলের অক্সিজেন। ফুটবলে এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও ক্লাবগুলো কখনই পায়নি প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা। বরং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অপরিকল্পিত সূচির জাঁতাকলে বারবার পিষ্ট হতে হয়েছে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ক্লাবগুলো একাট্টা হয়ে গতকাল গঠন করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন। সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন যার চেয়ারম্যান এবং আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের প্রেসিডেন্ট এ কে এম মোমিনুল হক সাঈদ সাধারণ সম্পাদক। ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন গঠনের মঞ্চেই ক্লাব কর্মকর্তা এবং সাবেক খেলোয়াড়রা বাফুফের বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকে দাঁড় করিয়েছেন আসামির কাঠগড়ায়।
উদ্যোগটা রুহুল আমিনেরই। ফুটবল নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করে আসছেন তিনি। তার উদ্যোগে গত বছর গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তার আর্থিক সহযোগিতায় এরই মধ্যে ৫০টির বেশি জেলায় লিগ আয়োজিত হয়েছে। এবার ক্লাবগুলোর দিকেও বাড়িয়ে দিলেন সহায়তার হাত। গতকাল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগের ক্লাবগুলোকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষণাও দিয়েছে তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক।
আয়োজনটি ক্লাব প্রতিনিধিদের জন্য হলেও রুহুল আমিন এখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন বেশ কজন ক্রীড়া সংগঠক এবং সাবেক ফুটবলারদের। তার ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠক এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য মোজাফফর হোসেন পল্টু, বাফুফের সাবেক সভাপতি এস এ সুলতান, বাফুফের সহসভাপতি বাদল রায় এবং বাফুফের কার্যনির্বাহী সদস্য ফজলুর রহমান বাবুল। এছাড়া সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সোনালী অতীত ক্লাবের সভাপতি হাসানুজ্জামান খান বাবলু, আবদুল গাফফার, ইমতিয়াজ সুলতান জনি।
পল্টু নবগঠিত ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনকে পূর্ণ সমর্থন জানান। একই সঙ্গে বাফুফের বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের কর্মকা-ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সালাউদ্দিনের কাছে আমার অনেক প্রত্যাশা ছিল। তার প্রতি ভালোবাসা রেখেই বলছি, ফুটবল নিয়ে আমি খুব হতাশ। আমি বিনয়ের সঙ্গে সালাউদ্দিনকে বলব তুমি আত্মবিশ্লেষণ করো। আত্মশুদ্ধি করো। সমর্থনহারা হয়ে পড়লে টিকতে পারবে না।’ আট বছর বাফুফের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এস এ সুলতান। তার কাছ থেকেই ২০০৮ সালে সভাপতির দায়িত্ব বুঝে নেন সালাউদ্দিন। দীর্ঘদিন পর সুলতান গতকাল ফুটবল নিয়ে এরকম আয়োজনে উপস্থিত হয়ে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন সালাউদ্দিনকে তার আমলে সহসভাপতি নির্বাচিত করার জন্য, ‘আমার মনে আছে লজ্জাবোধ। বর্তমান সভাপতিকে খুব স্নেহ করতাম। চরমভাবে সালাউদ্দিনের প্রতি দুর্বলতা দেখিয়েছিলাম। আমি করজোড়ে ক্ষমা চাচ্ছি তার জন্য। কারণ সংগঠক হিসেবে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ।’
বাফুফের সহসভাপতি হয়েও প্রাপ্য সম্মান পাননি বাদল রায়। শারীরিকভাবে অসুস্থতা হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাকে কোণঠাসা করে ফেলার অভিযোগ আছে বাফুফের সভাপতির বিরুদ্ধে। সেই বাদল রায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোভাবেই সালাউদ্দিনকে আর সভাপতি নির্বাচিত হতে দেবেন না, ‘তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন গদি বাঁচাতে। আমরাও যাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ফুটবলটাকে আর হেলাফেলায় শেষ হতে দেব না আমরা।’ সাবেক তারকা ফুটবলার আবদুল গাফফার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত ১২ বছরে আমরা কিছু খেলোয়াড় বাফুফের কর্মকা- নিয়ে অনেক কথা বলেছি। অনেক কিছুর বিরোধিতা করেছি। কিন্তু তিনি (সালাউদ্দিন) কর্ণপাত করেননি। আমি সালাউদ্দিনকে ধিক্কার জানাই ফুটবলকে এমন জায়গায় নামিয়ে আনার জন্য। সালাউদ্দিনের কাছে সবাই টিস্যু পেপারের মতো। ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দেন তিনি।’ স্বাগত বক্তব্যে তরফদার রুহুল আমিন বাফুফের কর্মকা-ের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি ফুটবলকে ভালোবেসে বছরে ৪০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করি। তাই গত ১০ বছরে ফুটবলের অধঃপতন দেখে খারাপ লাগে।’
ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের মঞ্চ থেকেই আগামী বছর নির্বাচনকে সামনে রেখে বলতে গেলে ঢাকার ক্লাবগুলোর মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়ে গেল।