‘মামা-খালু থাকলে চাকরি হয়, না হলে নয় লোকমুখে প্রচলিত এ কথার মিল পাওয়া গেছে সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, যেসব স্নাতকধারী ছেলেমেয়ের মা-বাবা উচ্চশিক্ষিত, তারা অশিক্ষিত মা-বাবার স্নাতকধারী ছেলেমেয়েদের চেয়ে দ্বিগুণ হারে চাকরি পাচ্ছেন।
বিআইডিএসের পাঁচ সদস্যের এক গবেষণা দল দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৫, ২০১৬ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা ১ হাজার ৫৭৪ জনের গবেষণাটি জরিপ করেছে। এতে বাংলাদেশে মা-বাবার শিক্ষার সঙ্গে স্নাতকধারী সন্তানদের চাকরি পাওয়ার একটি শক্তিশালী যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব মা-বাবার মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি রয়েছে, তাদের সন্তানদের ৪০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পরপরই চাকরি পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করা যেসব চাকরিপ্রার্থীর মা-বাবার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, তাদের মাত্র ২১ দশমিক ৯ শতাংশ পড়াশোনা শেষে চাকরি পাচ্ছেন। অর্থাৎ, শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে যে হারে চাকরি পাচ্ছেন, একই সমান পড়াশোনা করা অশিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা চাকরি পাচ্ছেন তার অর্ধেক।
‘ট্রেসার স্টাডি অব গ্র্যাজুয়েটস অব ইউনিভার্সিটিজ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে করা গবেষণা প্রতিবেদনটি গত ২৩ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন গবেষকরা।
এতে মা-বাবার শিক্ষার সঙ্গে স্নাতকধারী সন্তানদের বেকারত্বের হারের হেরফেরের তথ্য তুলে ধরে বিআইডিএস বলেছে, ‘বাবা শিক্ষিত নয়, এমন স্নাতকধারীদের ৫৬ শতাংশই বেকার। অন্যদিকে, যেসব বাবা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা, তাদের স্নাতকধারী সন্তানদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ।’
বিআইডিএসের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট জাবিদ ইকবাল, সিবান সাহানা, শহীদুল ইসলাম ও ওয়াহিদ ফেরদৌস ইবনকে নিয়ে গবেষণাটি করেছেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মিনহাজ মাহমুদ। গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, উচ্চশিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা স্নাতক শেষ করে দ্রুত চাকরি পাচ্ছেন। তাদের চাকরি পাওয়ার হার অশিক্ষিত মা-বাবার স্নাতক শেষ করা সন্তানদের তুলনায় দ্বিগুণ।
মা-বাবার শিক্ষার সঙ্গে সন্তানদের চাকরি পাওয়ার যোগসূত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুটি কারণে এটি ঘটতে পারে। একটি হলো, শিক্ষিত মা-বাবার কাছ থেকে উপযুক্ত নির্দেশনা পাচ্ছেন সন্তানরা। অন্যটি মা-বাবার নেটওয়ার্ক। শিক্ষিত মা-বাবার নেটওয়ার্কিং অশিক্ষিত মা-বাবার তুলনায় অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বেকারদের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, মা-বাবা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন সরকারি ও বেসরকারি খাতে বড় পদে থাকলে চাকরি পাওয়া সহজ হয়। ‘লোক’ না থাকলে খুব সহজে চাকরি পাওয়া যায় না বলে অনেক বেকার মনে করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করা মা-বাবার সন্তানদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৮ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মা-বাবার সন্তানদের বেকারত্বের হার ৪৬ শতাংশ। এসএসসি শেষ করা মা-বাবার স্নাতক সন্তানদের ৩৮ শতাংশ, এইচএসসি শেষ করা মা-বাবার স্নাতক সন্তানদের ৩৫ শতাংশ, ডিপ্লোমা শেষ করা মা-বাবার স্নাতক সন্তানদের ৩৪ শতাংশ এবং স্নাতক (সম্মান) শেষ করা মা-বাবার স্নাতক সন্তানদের ৩৮ শতাংশ বেকার।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মা-বাবার শিক্ষার কারণে সন্তানদের একাডেমিক পরীক্ষার ফলাফল ভালো হতে পারে। তাদের দ্বিগুণ হারে চাকরি হওয়ার কথা নয়। এটা যদি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ধারা হয় যে, শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা বেশি চাকরি পাচ্ছেন, তাহলে বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই এ বিষয়ে গভীরভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বিআইডিএস বলেছে, জরিপে অংশ নেওয়া স্নাতকধারীদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেকার। এরা গড়ে ১০ মাস ধরে বেকার থাকছেন। ৩৪ শতাংশ চাকরিপ্রার্থী স্নাতক শেষ করার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চাকরি পান। প্রায় ৬ শতাংশ স্নাতকধারী আত্মকর্মসংস্থানের দিকে যাচ্ছেন। ১৪ শতাংশ মেয়ে স্নাতক শেষ করে শ্রমবাজারের বাইরে থাকছেন, ছেলেদের মধ্যে এ হার ৫ শতাংশ।
বিআইডিএস বলছে, বেকারদের উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তত একটি করে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন। তবে কম বেতন, প্রতিষ্ঠানের সুনাম না থাকা এবং অসন্তোষজনক শর্তের কারণে তারা তাতে যোগ দেননি। বেকারদের বেশিরভাগই বলেছেন, ভালো চাকরি পাওয়ার মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা তাদের আছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা চাকরি পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করার হার বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া স্নাতকধারীদের ৪৪ শতাংশ চাকরি পাচ্ছেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ শতাংশ। স্নাতকধারীরা ৬০ শতাংশ যোগ দিচ্ছেন বহুজাতিক কোম্পানিতে। পরের অবস্থানে রয়েছে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে চাকরি করছেন। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকধারীরা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি পাচ্ছেন বেশি। অন্যদিকে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করাদের সরকারি চাকরি হচ্ছে বেশি। স্নাতকধারীদের চাকরিতে প্রবেশকালে বেতন হয় ২৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। চাকরির ধরনভেদে বেতনের হেরফের হয় না, বরং যোগদানকারী কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন, তার ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তরদের মাসে গড়ে ৪২ হাজার ২৪০ টাকা পান, কলা অনুষদের স্নাতকোত্তররা পান ৩৩ হাজার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাণিজ্যে স্নাতকের চেয়ে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তরের বেতন ১০০ গুণ বেশি।
১৫০ জন চাকরিদাতার সাক্ষাৎকারও নিয়েছে বিআইডিএসের গবেষক দল। তাদের ৯৩ শতাংশ বলেছেন যে, চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সব সময়ই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করা প্রার্থীদের খোঁজন। চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর সার্বিক শিক্ষাগত সনদ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সাফল্য, অতীত কর্ম-অভিজ্ঞতা, ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতার ওপর জোর দেন। ১০ শতাংশ চাকরিদাতা জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক তদবিরে তারা কিছু চাকরি দিতে বাধ্য হন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ শতাংশ স্নাতকধারী শ্রমবাজারের বাইরে থাকেন। তাদের ৩৭ শতাংশ আরও পড়াশোনা করতে আগ্রহী। ২৮ শতাংশ কম বেতনের কারণে চাকরিতে যোগদান করছেন না। আর ১৭ শতাংশ বিয়ে করছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। শ্রমবাজারের বাইরে থাকা স্নাতকধারীদের ৭১ শতাংশ ভবিষ্যতে চাকরির চেষ্টা করার কথা জানালেও বাকি ২২ শতাংশের চাকরির প্রতি কোনো আগ্রহ পাওয়া যায়নি। কারণ, হিসেবে তারা পারিবারিক দায়িত্ব, পরিবারের অনাগ্রহ ও আস্থার সংকটের কথা বলেছেন। শ্রমবাজারের বাইরে থাকা ৭০ শতাংশ স্নাতকধারী মনে করেন, তাদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও বাণিজ্য অনুষদে পড়াশোনা স্নাতকধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বিজ্ঞান অনুষদের স্নাতকধারীদের চেয়ে কম। যদিও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকধারীরা চাকরিও পাচ্ছেন বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদিও রাজনীতির সঙ্গে কম সম্পৃক্ত থাকেন, তবুও তারা মনে করেন, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য বড় একটি কার্যকর মাধ্যম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৪ শতাংশ ছাত্র খণ্ডকালীন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের ৯০ শতাংশ টিউশনি করেন। বাকি ১০ শতাংশ ছোটখাটো চাকরি ও ব্যবসা করেন। ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য এসব কাজ করছেন। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবারের খরচ দেন পার্ট-টাইম কাজ করে। ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, পার্ট-টাইম কাজের কারণে তাদের পড়াশোনা ক্ষতি হচ্ছে, তবে ২৮ শতাংশ পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ার কথা বিশ্বাস করেন না।