এবার সরকার গঠন করার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু বিষয়ে বারবার বলছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও তিনি বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। ভাষণে তিনি ‘সরকারি সেবা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় জীবনের সর্বত্র আইনের শাসন সমুন্নত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ’ করার কথা বলেছেন। এতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এগুলো তিনি বলার জন্য বলছেন না, এগুলো তিনি ‘মিন’ করছেন, অর্থাৎ কাজে পরিণত করার ইচ্ছা আছে বলেই তিনি এ বিষয়গুলো নিয়ে বারবার বলছেন এবং মানুষও বিশ্বাস করছেন, দেশে সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে তাদের মনে যতটুকু হাহাকার আছে তিনি এবার তা দূর করার সিরিয়াস চেষ্টা চালাবেন।
মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাসটা জন্মায় এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের পর। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের যে মহাজয় হয়েছে, তা দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এবার একটা ‘জাম্বো’ সাইজের মন্ত্রিসভা হবে। কিন্তু বাস্তবে মন্ত্রিসভার আকার গতবারের চেয়েও ছোট হলো, যদিও আমার মতে, উন্নয়নের যে কর্মযজ্ঞ চলছে, তার যথাযথ তদারকি ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণের কোনো বিকল্প নেই এবং সে হিসেবে কিছু কিছু মন্ত্রীর দায়িত্বকে ভাগ করে নতুনদের হাতে দিতে হবে।
শুধু আকারেই নয়, মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচনেও চমক দেখা গেল। অনেক ডাকসাইটে নেতা বাদ পড়লেন, যুক্ত হলো একেবারে আনকোরা ২৭টি মুখ। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের সবাই পূর্বসূরি অনেকের চেয়ে বেশ নমনীয়, যার ফলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য অনেক সহজ হবে। এরই আলামত হিসেবে হয়তো প্রধানমন্ত্রী প্রথম সাক্ষাতেই মন্ত্রীদের বলেছেন তারা সব সময়েই তার ‘নজরদারি’তে থাকবেন। তিনি যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সভা করছেন, সেখানেও এ কথাটিই জোর দিয়ে বলছেন, দুর্নীতিকে সহ্য করা হবে না। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তো তিনি এমনও বলেছেন, মন্ত্রী হয়ে টাকা বানানো যায়, তবে সেদিকে নজর দিলে মন্ত্রীদের ‘পচে’ যেতে হবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এ বার্তা পেয়েই হয়তো একের পর এক মন্ত্রী তাদের মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে চলেছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের সম্পদবিবরণীও জমা দিতে বলেছেন। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নড়েচড়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও এখনো তা ‘চুনোপুঁটি’তেই সীমাবদ্ধ, তারা সম্প্রতি বেশ কিছু বড় দুর্নীতির ঘটনা উন্মোচন করেছেন, যেগুলো দুর্নীতিপ্রবণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। তদন্ত চলাকালেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবৈধ সম্পদ নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার যে ঘোষণা তারা দিয়েছেন, তা-ও অবৈধ সম্পদধারীদের জন্য একটা কঠোর বার্তা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী অবশ্য নির্বাচনের আগে থেকেই বলে আসছিলেন। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় তার সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে, তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এরপর তিনি মনোযোগ দেবেন দুর্নীতি ও মাদক দমনের দিকে। এ জন্যই একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার দিয়েছিল, সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলা হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে তো নির্বাচনের আগেই অভিযান শুরু হয়েছে, যেখানে সম্প্রতি নতুন এক মাত্রা যুক্ত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, মাদক কারবারিদের স্বর্গ বলে পরিচিত টেকনাফে এখন মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি চলছে। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রাণ হারানোর ভয়ে সেখানে ছোট-বড় সব মাদক কারবারিই সরকারের দেওয়া আত্মসমর্পণের সুযোগ নিতে চাইছে।
তবে এ সরকারের যে বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন এবং রাজনৈতিকভাবে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, তা হলো, বিরোধী পক্ষের প্রতি সরকারের নরম মনোভাব (soft approach)। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপর প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তার সরকার সবার সরকার, শুধু যারা তাকে ভোট দিয়েছেন, তাদের সরকার নয়। একই বিষয় তিনি গত শুক্রবারের ভাষণেও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সরকারের দৃষ্টিতে দলমত-নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিক সমান। আমরা সবার জন্য কাজ করব।’ শুধু তা নয়, তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
কেউ কেউ বলতে পারেন, প্রায় এমন কথা প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালে সরকার গঠনের প্রাক্কালেও বলেছিলেন। কিন্তু এটা মানতে হবে যে ২০০৯ সাল আর ২০১৯ সাল এক নয়। তখন তার সামনে ছিল একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এখন যা খুবই দুর্বল। শক্তের ভক্ত নরমের যম, বাংলা এ প্রবাদটি যদি তিনি মানতেন, তাহলে অন্তত এ সময়ে এমন আহ্বান জানাতেন না।
এসব বলার মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্টত বিএনপির প্রতি একটা কোমল হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি যে শর্ত দিয়েছেন, ‘আমাদের ঐক্যের যোগসূত্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ন্যায়-বিচার এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি’, তা মেনে বিএনপি যদি ওই হাতটা ধরে, তাহলে দেশে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এতে যে শুধু দেশ-জাতি লাভবান হবে, তা নয়, রাজনীতির নানা কৌশলে আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হয়ে বিপর্যস্ত বিএনপি নিজেও মূলধারায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু বিএনপি সে পথে হাঁটবে বলে মনে হচ্ছে না। এরই মধ্যে দলটির মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর এ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আমাদের রাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের যে পর্যায়ে আছে, তার জন্য জাতীয় ঐক্য খুবই জরুরি। তাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন শান্তি, জাতির প্রত্যেকটি অংশের মধ্যে কর্মোদ্যোগ। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান সময়োপযোগী তা বলতেই হবে।
তবে, বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যা-ই করুক, দেশে যে জনগণের স্তরে এরই মধ্যে এক ধরনের জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়ে গেছে, তা স্বীকার করতেই হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিকে তাকালেও বিষয়টা উপলব্ধি করা যায়। এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারে যত ধরনের মানুষ যুক্ত হয়েছিল, তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব ঘরানার একেবারে বিপরীত অনেক দল বা গোষ্ঠীকে তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে নিয়ে এসেছে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলেম-ওলামাদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়, আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলামের কথা। অতিমাত্রায় রক্ষণশীল দেওবন্দি ঘরানার এ গোষ্ঠীটি বরাবরই আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবিরের সঙ্গে সখ্য রেখে চলেছে। এ ব্যাপারে অনেক বিশ্লেষকই একমত যে, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পেছনে ছিল হেফাজতের আওয়ামীবিরোধী তৎপরতা। কিন্তু শেখ হাসিনা গৃহীত নানা কৌশলের কারণে এ গোষ্ঠীটি এখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের একটা উদারনৈতিক ভাব থাকলেও তারা মূলত বিএনপি ঘরানার দল। এরাও এবার আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে নির্বাচন করেছে। গত কয়েক বছরে তৃণমূল পর্যায়ে অনেক স্থানে যে শত শত বিএনপি, এমনকি জামায়াত, নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে তা-ও কিন্তু তাৎপর্যহীন নয়। এ প্রক্রিয়ায় আওয়ামীবিরোধী শিবিরে অনেকেই এখন সরকারি দলের সঙ্গে একটা সমঝোতা করে ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাচ্ছে, যা এক ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
এবারের নির্বাচনে যেসব ব্যবসায়ী সংগঠন নজিরবিহীনভাবে প্রকাশ্য সভা করে সরকারি দলকে সমর্থন দিল, তা কিন্তু আওয়ামী লীগের ওই ‘সমন্বয়বাদী’ রাজনীতিরই ফল। এ প্রসঙ্গে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায়, বিশেষ করে বিভিন্ন স্তরের শিল্পীরা, যেভাবে নৌকার পক্ষে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, তার কথাও বলা যায়। অভিযোগ আছে, তাদের বড় একটা অংশ একসময়ে বিএনপি বন্দনায় মত্ত ছিল। এ কথাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না যে, এসব গোষ্ঠীর প্রায় সবাই রং পাল্টেছে স্রেফ কিছু সুবিধার আশায়। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না, কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হলেও আওয়ামী লীগ যে তার বিরোধীপক্ষে ভাঙন ধরাতে পেরেছে, তা এ দেশে বা উপমহাদেশের রাজনীতিতে একেবারে নতুন কিছু নয় এবং এর একটা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ডিভিডেন্ড আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের সর্বস্তরে সরকারের প্রতি যে আনুগত্য ও সমর্থন দেখা যাচ্ছে, তা-ও কিন্তু একই সঙ্গে নজিরবিহীন ও গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের চিরাচরিত সংজ্ঞা থেকে অনেকেই এ প্রবণতাকে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলবেন, কিন্তু একটা সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে শান্ত রাখার ক্ষেত্রে এর যে একটা ভূমিকা আছে তা অস্বীকার করা যাবে না।
যদি আমজনতার কথা বলা হয়, সেখানেও দেখা যাবে অনেক কট্টর বিএনপি সমর্থকও এবার নৌকার পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। গত ১০ বছরে সারা দেশে প্রায় সব সেক্টরে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল থেকে বিএনপির সমর্থকরা বঞ্চিত হননি। বগুড়া বা বৃহত্তর নোয়াখালীর দিকে তাকালেই বিষয়টা বোঝা যায়। এ দুটো এলাকা বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত। কিন্তু কেউ দাবি করতে পারবে না, এ সরকারের অধীনে এ এলাকাগুলোর রাস্তাঘাট উন্নত হয়নি বা বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সেক্টরে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে, তা এ এলাকাগুলোতে হয়নি। সরকারি-বেসরকারি সব খাতে এ সময়ে যে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ঘটেছে, তার সুযোগ সব রাজনৈতিক রঙের মানুষরাই পেয়েছেন। ভোটের দিনে এমন বেশ কিছু বিএনপি সমর্থকের দেখা এবার মিলেছে, যারা ১৫ বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন এবং পেনশন সারেন্ডার করার পরও সরকারের বদান্যতায় আবার পেনশন পাচ্ছেন। তারা এ জন্য ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশের লক্ষ্যে এবার নৌকায় ভোট দিয়েছেন। মোট কথা, প্রধানমন্ত্রী যে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, তা জনগণের স্তরে এরই মধ্যে ঘটে গেছে। এখন প্রয়োজন তাকে আরও সংহত করা। আর এ জন্য প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন।
লেখক
সাংবাদিক ও কলামনিস্ট