চারদিকে পাহাড়, সবুজ বৃক্ষরাজি আর বনাঞ্চল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও ফটিকছড়ি উপজেলার সীমান্তর্বতী কাঞ্চননগর ইউনিয়নের এক ছায়াঘেরা গ্রামের নাম বাইন্যাছোলা-মানিকপুর।
এই গ্রামে বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও ত্রিপুরা মিলে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বসবাস। পাহাড়ি-বাঙালির এক সম্প্রীতির মেলবন্ধন এখানে। পাহাড়ের উঁচু, নিচু, ঢালু স্থানে ঝুপড়িঘর করে বাস করে এই গ্রামের মানুষগুলো।
ভৌগোলিক অবস্থান ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট এই মানুষগুলো শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক পিছিয়ে। কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয় না
থাকায় তাদের সন্তানগুলোও বেড়ে উঠছিল যেনতেনভাবে। তবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের আলোর পথ দেখাতে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম সাজাদুল ইসলাম, লক্ষ্মীছড়ি জোন কমান্ডার লে. মিজানুর রহমান মিজান এবং স্থানীয় কাঞ্চনপুর ইউপির চেয়ারম্যান রশিদ উদ্দিন চৌধুরী কাতেব।
তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় সমাজহিতৈষী ও এলাকার বিত্তবানদের সহযোগিতায় ১১১ দশমিক ৫ শতাংশ ভূমির ওপর টিনের চালায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিদ্যাপীঠ। স্বপ্নের বাতিঘরটির নামকরণ হয়েছে ‘বাইন্যাছোলা-মানিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়’।
গত ১০ জানুয়ারি বিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এদিন সমস্বরে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পায়রা ও বেলুন ওড়ানোর পর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বই। বিদ্যালয়ের আঙিনায় করা হয় বৃক্ষরোপণ।
এর আগে এই গ্রামের ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। ফলে এখানকার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই প্রাথমিকের পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। বিদ্যালয়টি নির্মিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই এলাকার বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর ছেলেময়েরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেল।
বিদ্যালয়টি এরই মধ্যে ৩৮৭ জন শিক্ষার্থী, একজন প্রধান শিক্ষক ও আটজন সহকারী শিক্ষক নিয়ে তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। এ বিদ্যালয়ে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বাইন্যাছোলা এলাকার সাঁওতালপাড়া, সমুরপাড়া, মহেষকাটা, দ-িপাড়া, হলুদ্দাপাড়া ও ফটিকছড়ি উপজেলার মানিকপুর এলাকার টিলাপাড়া, সাতগড়িয়াপাড়া, নাপিতপাড়া, ফেদুরপাড়া ও বানতিরপাড়ার শত শত শিক্ষার্থী পড়ালেখার সুযোগ পাবে।
বাইন্যাছোলার হলুদ্দাপাড়ার বাসিন্দা মৃণালী চাকমা ও স্বর্ণালী চাকমা দুই বোন। তারা এই বিদ্যালয়ের ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে তারা বলে,
‘প্রাথমিকের পড়ালেখা শেষ করেছি। আশপাশে কোনো স্কুল না থাকায় মায়ের সাথে ক্ষেতের কাজে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। কিন্তু এই স্কুল হওয়াতে আমরা পড়তে পারছি। আমরা অনেক খুশি।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পরিশ্রম তখন সার্থক হবে, যখন তারা মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবে।’
স্থানীয় কাঞ্চননগর ইউপির চেয়ারম্যান রশিদ উদ্দীন চৌধুরী কাতেব বলেন, ‘এলাকার শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে একটা প্লাটফর্ম তৈরি করেছি মাত্র। এখনো অনেক কাজ বাকি।’