বিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সকল বিস্ময়কর আবিষ্কারের মধ্যে অন্যতম অ্যান্টিবায়োটিক। সাধারণ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ বা ইনফেকশনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিক শব্দের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ অ্যান্টি ও বায়োস থেকে। অ্যান্টি অর্থ বিপরীত এবং বায়োস অর্থ জীবন। অ্যান্টিবায়োটিক জীবিত ব্যাকটেরিয়া তথা অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে। ব্যাকটেরিয়া গঠিত সংক্রমণ যেমন নিউমোনিয়া, মূত্রনালিৎ বা মূত্রথলির সংক্রমণ, বিভিন্ন যৌন সংক্রমণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি ভাইরাস গঠিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। একটি জীবাণুর বিরুদ্ধে যেমন সব অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, তেমনি সব জীবাণুর বিরুদ্ধেও একটি অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই সামান্য জ্বর-সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে তীব্র যে কোনো রোগের জন্যই আমরা যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে চলেছি। অ্যান্টিবায়োটিকের এমন লাগামহীন ব্যবহারের ফলে শরীরে তৈরি হচ্ছে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’। ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বলতে বোঝায় অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ একটি ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করার জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকে সব উপাদান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তাতে আর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অযথা ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পূর্ণ কোর্স পূর্ণ না করে সেবন করার কারণে সেবনকৃত অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সহনীয় হয়ে পড়ে এবং ক্রমাগত ‘রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া’ রূপে সংখ্যা বৃদ্ধি করে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এতটাই ভয়াবহ যে একে ক্যানসারের চেয়েও বেশি মারাত্মক বলে মনে করা হয়। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির মলমূত্র, নিশ্বাসসহ নানা মাধ্যমে এসব রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং সুস্থ মানুষকেও আক্রমণ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামি কয়েক বছরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আর মানুষের শরীরে কাজ করবে না।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে বাংলাদেশে কত মানুষ মারা যায় এমন কোনো জরিপ বা গবেষণা না থাকলেও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের করা এক গবেষণা জরিপ থেকে জানা যায়, রাজধানীতে শতকরা ৫৫ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর ভয়াবহতা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে যা আমাদের দেশের মতো এত ভয়াবহ না হলেও উপেক্ষা করার মতো নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে ২৩ হাজার আমেরিকান আর বিশ্বে সাত লাখ মানুষ ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের’ কারণে মারা যাচ্ছে।
তাই অ্যান্টিবায়োটিকের এমন করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহারে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট’ সম্পর্কে সচেতন নয়। এর জন্য ডাক্তারদের সক্রিয় ভূমিকা খুবই প্রয়োজন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সামান্য সময় নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা একান্ত জরুরি। চিকিৎসকের পাশাপাশি গণমাধ্যম এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমাদেরও অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে তা নিতে হবে কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করতে হবে। আর যথা রোগের জন্য যথা মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স পুরোটা সম্পূর্ণ করতে হবে, অল্প বা অর্ধেক সেবন করে বন্ধ করে দিলে চলবে না। মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক অবাধে বিক্রিরোধে শাস্তিযোগ্য আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
তানভীর আহমেদ রাসেল
লেখক: শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়