বিদায়, কবি আল মাহমুদ

তিরাশি বছর নেহাতই কম সময় নয়। তারও চেয়ে বড় কথা, দীর্ঘ এ জীবনের অধিকাংশ সময় তার কলম ছিল স্বচ্ছন্দ ও সচল। জীবনের শেষ সময়ে এসে দৃষ্টিশক্তি কমে গিয়েছিল, তবু থেমে থাকেনি তার সৃজনশীলতার প্রবাহ। প্রায় দৃষ্টিহীন হয়েও ডিকটেশন দিয়ে দিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা, গল্প, এমনকি উপন্যাসও। এ লেখাগুলো নানাভাবে পাঠককে আপ্লুত ও প্রাণিত করেছে। জীবনের শেষ সময়ে শারীরিক প্রতিকূলতা তাকে যেমন বাঁধতে পারেনি তেমনি জীবনের প্রথম পর্যায়েও নানা প্রতিকূলতা তাকে আটকাতে পারেনি। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে কবিতার মতো বিশুদ্ধ শিল্প সৃষ্টি করতে গিয়ে তাকে যে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তাকে লড়াই ছাড়া আর কোনো শব্দে ধারণ করা যায় না। আত্মজীবনী ও সাক্ষাৎকারে বহুভাবে বহুবার সে লড়াইয়ের কথা বলেছেন আল মাহমুদ। শুধু কবিতা লেখা নয়, কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জনের জন্যও যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। এ সংগ্রামের রেশ তার মৃত্যু পর্যন্ত তাকে তাড়িত করেছে। সাহিত্য ও সমাজে আল মাহমুদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আলোচিত একটি প্রসঙ্গ।

কবি হিসেবে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। আত্মপ্রকাশের মুহূর্তে তিনি বুদ্ধদেব বসুসহ ত্রিশের প্রথিতযশা কবিদের মনোযোগ কেড়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ অঙ্গন তাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। গত শতকের ত্রিশের দশকে আধুনিক বাংলা কবিতার যে উত্থান ঘটেছিল, তাতে পূর্ববঙ্গের অংশগ্রহণ ছিল সামান্য। মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে পূর্ববঙ্গের কবিরা কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণের মূলধারায় ছিলেন না। এর ফল হিসেবে আধুনিক বাংলা কবিতায় পূর্ববঙ্গের কবিদের অংশগ্রহণ ছিল কম।

দেশভাগের পর পঞ্চাশের শামসুুর রাহমান-আল মাহমুদের প্রজন্মই প্রথম পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলা কবিতার আধুনিক ধারায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। পঞ্চাশের কবিদের এ ভূমিকা ঐতিহাসিক। আল মাহমুুদ শুধু আধুনিক কবিতাই রচনা করেননি। তার কবিতা একান্তই পূর্ববঙ্গের তথা বাংলাদেশের। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাব, ভাষা, শব্দ ও সুর তার কবিতায় প্রথম যেভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠল, তা বাংলা আধুনিক কবিতায় অভূতপূর্ব ছিল। তাই পুুরো বাংলা সাহিত্য একই সঙ্গে বিস্ময় ও আনন্দ সহকারে আল মাহমুদের জীবনব্যাপী সৃজনশীলতাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তার সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হবে না। বরং জীবনের নানা বাঁকে তাকে নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, মৃত্যুর পর সে বিতর্ক প্রশমিত হয়ে তার রচনাই সর্বাগ্রে বিবেচিত হবে। এ অঞ্চলের জনমানুষের ভাষা তার সাহিত্যে যেভাবে প্রাণ পেয়েছে, তাতে আধুনিক কবিতার পাঠকমাত্রই আল মাহমুদের কবিতার কাছে ফিরে ফিরে আসবে। কবিতার এই বিশিষ্ট অর্জনের মধ্যেই তার সাহিত্যকৃতি সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন অগ্রগণ্য ও শক্তিমান ছোটগল্পকার। ছোটগল্প ও উপন্যাসে মানবজীবনের অতল বাসনা ও কামনার যে জগৎ উন্মোচন করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার করেছে। তার বহু ছড়া কয়েক প্রজন্মের শিশুদের কণ্ঠস্থ হয়ে রয়েছে। তার কবিতা স্কুলপাঠ্য হয়েছে। প্রজন্মগুলোর স্মৃতির সঙ্গী হয়ে রয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে আল মাহমুদ সব্যসাচী সাহিত্যিক। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হারাল সবচেয়ে বড় কবিকে। বাংলা কবিতার বৃহৎ অঙ্গনে তার স্থান পাকাপোক্ত হয়ে থাকবে কিন্তু বাংলাদেশ হয়তো শিগগিরই এমন আরেক কবিকে পাবে না। অনেকেই আশা করেছিলেন, পথিকৃৎ কবি আল মাহমুদের মৃত্যুর পর মতাদর্শের কাঁটাতার পেরিয়ে সবাই একত্র হয়ে তাকে বিদায় জানাতে পারবে। সেটি হয়েছেও। সাধারণ পাঠকরা দলমতনির্বিশেষে তাকে বিদায় অভিবাদন জানিয়েছেন। পাঠকদের মতো উদারতা নিয়ে সমাজের গুণীরাও এগিয়ে এলে আমাদের সমাজের উচ্চতা বাড়ত। আল মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, লেখক-সাহিত্যিকদের সংগঠিত করেছেন। পরে বিপরীত মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  সমর্থন পেয়েছেন তিনি। কিন্তু মায়াবী পর্দা দুলে ওঠার পর মূলধারা থেকে তার যে বিচ্যুতি ঘটেছিল সে রেশ মৃত্যু পর্যন্ত তাকে বহন করতে হলো।  ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাংলা ভাষার সন্তান আল মাহমুদকে আমরা বিদায় জানাচ্ছি। সমবেদনা জানাচ্ছি তার আত্মীয়-পরিজনদের।