ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাসপাড়ে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই শায়িত হবেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। আজ রবিবার দুপুরে সদরের দক্ষিণ মৌড়াইল গ্রামে জানাজার পর তাকে দাফন করা হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর প্রেস ক্লাব ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পৃথক জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়ার অনুমতি চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। কারণ তার রাজনৈতিক মতাদর্শ। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত শুক্রবার রাতে মৃত্যুবরণ করেন আল মাহমুদ। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে শুক্রবার রাতেই শোক জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাসাস সভাপতি গাজী মাজহারুল আনোয়ার। শনিবার শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের পক্ষ থেকে অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে। কবির পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছা ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাবেন তাকে। কিন্তু সেখানে মরদেহ রাখার অনুমতি মেলেনি। আল মাহমুদের বড় ছেলে মীর শরীফ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আবেদন করেও শহীদ মিনারে মরদেহ নেওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি। আব্বা দেশের বড় কবি। অথচ তার মরদেহ নেওয়া গেল না শহীদ মিনারে। এটা আমাদের জন্য কষ্টের।’
শনিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আনা হয় কবির মরদেহ। সেখানে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ছাড়া দেশের প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের তেমন দেখা যায়নি। এরপর সোয়া ১২টায় প্রেস ক্লাবে নেওয়া হয় দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করা এই সাহিত্যিকের মরদেহ। সেখানে কবির মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারসহ কবির শুভাকাক্সক্ষীরা। এ সময় কবির আরেক ছেলে মীর মোহাম্মদ মনির বলেন, ‘আব্বা দেশের মানুষের জন্য ভেবেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তিনি দেশের বড় কবি ছিলেন। কিন্তু তার মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হোক। সেটাও করা গেল না।’ কথাগুলো বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি।
গাজী মাজহারুল বলেন, ‘মানুষের মাঝে যিনি বিরাজমান, তার মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়া না নেওয়াতে কিছু আসে-যায় না। আল মাহমুদ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো স্বীকৃতি নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। মৃত্যুর পরও মানুষ তাকে মনে রাখবে।’
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নেয়। সেখানে কবির ছোট ছেলে মীর মোহাম্মদ আনিস বলেন, ‘আব্বার মরদেহ আজই (শনিবার) ব্রাহ্মণবাড়িয়া নেওয়া হবে। তৃতীয় জানাজা শেষে রবিবার বাদ জোহর শহরের মৌড়াইলে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।’
আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদরের দক্ষিণ মৌড়াইল গ্রামে কবির পৈতৃক ভিটায় শুক্রবার রাত থেকেই ছিল স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। কবির মৃত্যুর খবর জানার পরপরই মোল্লাবাড়ি ও মীরবাড়ি এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি জানান, কবির বাড়ি সংলগ্ন নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাদ জোহর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাকে দক্ষিণ মৌড়াইল কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। কবির এই আত্মীয় জানান, জানাজা ও দাফনের সময় জানিয়ে শনিবার বিকেল থেকে শহরে মাইকিং করা হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর ধানম-ির শংকরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আল মাহমুদকে। শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ছিলেন। শিল্পকলা একাডেমির পরিচালকও ছিলেন তিনি। সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন আল মাহমুদ। লোক-লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। আল মাহমুদ ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।