বিভীষিকার রাত

চার শিশুসন্তান নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন মা রহিমা আক্তার (৪০)। রাত ৩টার দিকে দাউ দাউ করে জ¦লছে বস্তি। ঘরে তালা মারা, ফলে শিশু নারগিসকে (১০) নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হন তিনি। এরপর অবস্থা বেগতি দেখে অন্য তিন সন্তানকে আনতে আবার ঘরে যান। এর কয়েক ঘণ্টা পর ওই ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ রহিমার পোড়া লাশ।

আগুন থেকে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া নারগিস এভাবেই বর্ণনা করছিল। মা ভাইবোনহারা নারগিস দেশ রূপান্তরকে জানায়, ‘গভীর রাতে হঠাৎ আগুন লাগার খবরে পুরো বস্তিতে হইচই পড়ে যায়। আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে চারদিকে শুনি আগুন, আগুন। তখনই আগুন থেকে বাঁচতে ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কীভাবে বের হব? ঘরের ভেতরে তালাবদ্ধ ছিল। ধোঁয়ার কারণে চাবি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে পেছনের দরজা ভেঙে আমি ও মা বের হয়ে পড়ি। কিন্তু মা ঘুমে থাকা আমার তিন ভাইবোনকে ঘর থেকে আনতে গিয়ে আর বের হতে পারেননি। মাসহ আমার তিন ভাইবোন একসঙ্গে ভেতরেই আগুনে পুড়ে মারা গেল।’

গত শনিবার গভীর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর চাক্তাইয়ের ভেড়ামার্কেট এলাকার বস্তিতে ছিল আতঙ্ক আর আর্তনাদ। পুড়ে মারা যায় দুই পরিবারের সাতজনসহ মোট নয়জন।

বস্তির প্রবেশমুখেই হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলার ওসমানপুর গ্রাম থেকে এসে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি মুদির দোকান করতেন সুরুজ মিয়া। দোকানের পাশের একটি বাসায় চার সন্তান নিয়ে থাকতেন রহিমা আক্তার। সুরুজ মিয়ার বড় ভাই ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চুরি হওয়ার আশঙ্কায় অধিকাংশ সময় বাসায় সবসময় ভেতর থেকে তালাবদ্ধ রাখা হয়। আমার ভাই দোকানে ছিল। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে কেউ কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না। ঘরের ভেতর থেকে তালাবদ্ধ থাকায় আমার ভাই, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে বের করতে পারেনি। না হলে হয়তো আমার ভাইয়ের পরিবার প্রাণে বাঁচত। আমাদের সব শেষ হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।

মায়ের দগ্ধ দেহ, নিখোঁজ মেয়ে

একই ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা গেছেন আয়েশা বেগম (৩৭), তার মেয়ে ঋতু (১১) এবং ভাগ্নে সোহাগ (১৯)। মৃত রিপনের স্ত্রী আয়েশা বেগম ভোলা জেলার ব্যাংকারহাট বাজার এলাকার মোজ্জাম্মেল ফরাজির মেয়ে। আয়েশা বেগমের ভাই মনির হোসেন বলেন, ‘আমার বড় বোন এক মেয়ে ও ভাগ্নে সোহাগ নিয়ে বাসায় থাকত। রাতে আগুনে পুড়ে সব শেষ হয়ে গেল। বোন ও ভাগ্নের মরদেহ পেলেও এখনো ভাগ্নি ঋতুর মরদেহ খুঁজে পাইনি।’

অসুস্থ মেয়েজামাইকে দেখে এসে প্রাণ গেল শাশুড়ির

একইভাবে আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন হাসিনা বেগম (৩৫)। তার স্বামী সামশুল আলম জানান, স্ত্রীকে বের করতে অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। হঠাৎ আগুন দেখে বাসার ভেতর অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। আমি অনেক কষ্টে বেরিয়ে প্রাণে বাঁচলাম।

হাসিনা বেগমের দুই মেয়ে সাদিয়া ও শাহীন। বছর দেড়েক আগে বড় মেয়ে সাদিয়ার বিয়ে হয়। বড় বোনের সঙ্গে ছোট বোন শাহীনও নগরীর চান্দগাঁওয়ের সিএমবি এলাকায় ভাড়া বাসেন থাকেন।

সাদিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জামাই অসুস্থ, তাই গতকাল (শনিবার) সকালের দিকে মা, আমার বাসায় তাকে দেখতে এসেছিলেন। থাকতে জোর করেছিলাম। কিন্তু বাবা আসেননি তাই সন্ধ্যার দিকে বস্তিতে ফিরে গিয়েছিলেন। রাত ১১টার দিকে মা আমাকে ফোনও করেছিলেন। কিন্তু আমি ঘুমিয়ে পড়ায় ফোন ধরতে পারিনি। পরে ভোরে আমার এক বান্ধবী আমাকে মায়ের মৃত্যুর সংবাদ দিল।’