রাজশাহীর আট উপজেলা পরিষদের নির্বাচন আগামী ৮ মার্চ। প্রতীক বরাদ্দ না হলেও নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা; সঙ্গে আলোচনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। এসব এলাকায় মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মাঠে থাকা দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিদ্রোহ থামিয়ে বিভক্তি নিরসন করে সব উপজেলাতেই দলের একক প্রার্থী রাখতে তৎপরতা শুরু করেছেন বলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ জানিয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগে রাজশাহীর উপজেলাগুলোতে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী থাকার বিষয়ে আশাবাদীই ছিলেন স্থানীয় নেতারা। কিন্তু মনোনয়ন চূড়ান্ত করার পর চিত্র পাল্টে যায়। ছয়টি উপজেলাতেই বিকল্প প্রার্থীরা মাঠে থাকার ঘোষণা দেন। বাকি দুটিতে বিকল্প প্রার্থী না থাকলেও সেগুলোতেও আওয়ামী লীগের একাংশকে কাছে পাচ্ছেন দলীয় প্রার্থী। বড় একটি অংশ থাকছে নিষ্ক্রিয়। তাদের নিষ্ক্রিয়তাও নৌকার প্রার্থীর জন্য ক্ষতির কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান চঞ্চল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচন অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার আভাস পাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এক কাতারে না এলে অনেক জায়গাতেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।’
রাজশাহীর আটটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ২৬ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। এর মধ্যে তানোরে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী লুৎফর হায়দার রশিদ ময়না ছাড়া আওয়ামী লীগ বা অঙ্গসংগঠনের কেউ প্রার্থী হননি। তার প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির শরিফুল ইসলাম। সেখানকার দলের একটি অংশ এখনো ময়নার পক্ষে মাঠে নামেনি। গোদাগাড়ীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম। তার বিপক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বদিউজ্জামান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এ নিয়ে বিভক্ত স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
দুর্গাপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের বিপক্ষে মাঠে থাকার বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল মজিদ। মাঠ পর্যায়ে দুই নেতারই রয়েছে দাপট। এর বাইরেও প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের মণ্ডল। মোহনপুরে নৌকার প্রার্থী আবদুস সালামের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আফজাল হোসেন বকুল।
বাগমারায় দলের প্রার্থী অনিল কুমার সরকার। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাকিরুল ইসলাম সান্টু চুপ থাকলেও জেলা যুবলীগের মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক বাবুল হোসেন প্রার্থী হয়েছেন। এখানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডি এম জিয়াউর রহমানও প্রার্থী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভোটের মাঠে থাকলে আর সান্টুর অনুসারীরা নৌকার পক্ষে মাঠে না নামলে অনিল বেকায়দায় পড়তে পারেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
পুঠিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী জি এম হিরা বাচ্চুর বিপক্ষে দলের অন্য কোনো নেতা প্রার্থী নেই। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহসানুল হক মাসুদ দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তার অনুসারীরা ভোটবিমুখ। এখানে আরও প্রার্থী আছেন জাতীয় পার্টির আনসার আলী ও স্বতন্ত্র হিসেবে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মোখলেসুর রহমান। এসব মিলিয়ে খুব সুখকর অবস্থানে নেই জি এম হিরা বাচ্চু।
চারঘাটে দলের প্রার্থী ফখরুল ইসলামের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি টিপু সুলতান। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন। বাঘায় নৌকার প্রার্থী লায়েব উদ্দিন লাভলুর বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেরাজুল ইসলাম মেরাজ।
সবগুলো উপজেলায় বিদ্রোহীদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে আনতে কাজ শুরু করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। গত বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজশাহীর পুঠিয়া ও চারঘাটে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পর্যায়ক্রমে রাজশাহীর প্রতিটি উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে জানান।
জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক শরিফুল ইসলাম জানান, আসাদুজ্জামান আসাদ পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরের নামাজ গ্রামে যান। সেখানে নেতাকর্মীদের নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মরহুম আব্দুস সাত্তারের কবর জিয়ারত করেন। পরে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি চারঘাট উপজেলায় যান। সেখানেও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনায় বসেন।
আসাদুজ্জামান আসাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকার বিপক্ষে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। আমরা আশাবাদী, আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অনেকেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠেও থাকবেন।’