উপন্যাসের পাতায় হাওয়া

দেখতে দেখতে অমর একুশে গ্রন্থমেলার দুই-তৃতীয়াংশ সময় পেরিয়ে গেল। মেলার এই অংশে এসে পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিক্রিও। বিক্রেতারা জানান, এবারও বেশি বিক্রি হচ্ছে উপন্যাস। পুরনো উপন্যাসগুলোর প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেশি, আগ্রহ রয়েছে নতুন উপন্যাসেও। এখনো বিক্রির তালিকায় উপরের দিকে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস।

গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখা যায়, পাঠকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে উপন্যাসের বই সামনে রেখে বেশিরভাগ স্টল সাজিয়েছেন প্রকাশক। অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, “এ বছর প্রকাশনীর এখন পর্যন্ত বেশি বিক্রি হয়েছে উপন্যাস। পাঠকের পছন্দের তালিকায় আছেÑ হরিশংকর জলদাসের ‘প্রস্থানের আগে’, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প’ ও নাসরীন জাহানের ‘সিসেমের দ্বিতীয় দরজা’।”

হুমায়ূন আহমেদের নতুন কোনো বই না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে তার রচনাসমগ্র ও সংকলন। এ ছাড়াও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিভিন্ন বছর প্রকাশিত উপন্যাসের নতুন মুদ্রণের চাহিদা রয়েছে বলে জানান তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক তরিকুল ইসলাম রনি।  অবসর প্রকাশনীর কর্ণধার এ কে এম ফজলুর রহমান বলেন, ‘উপন্যাস লেখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তার বইয়ের চাহিদা এখনো অনেক। তা ছাড়া সমসাময়িক বিভিন্ন উপন্যাস পছন্দ করছে পাঠক।’

এ বিষয়ে কথা হয় লেখক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমি সাধারণত যখন ফিকশন লিখি তখন চিন্তা করি, আমার লেখা মানুষকে স্পর্শ করবে কি না। গল্প ছিমছাম রেখেই লেখা এগিয়ে নিই। ‘কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প’ বইটিতেও আমি ভাষা সহজ রাখার চেষ্টা করেছি।” উপন্যাসের ক্ষেত্রে পাঠকের আগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সব জায়গায় ফিকশন গল্প পড়ার আগ্রহ বেশি। কারণ একটা ফিকশন বই পড়ার সময় পাঠকের ভালো লাগলে শেষ পর্যন্ত পড়ে, খারাপ লাগলে রেখে দেয়। কিন্তু প্রবন্ধের ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিকের বিপরীত চিন্তার একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত তথ্যগুলোর সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হওয়ার জন্য পড়ে যান। এজন্য যারা সিরিয়াস পাঠক, তারাই নন-ফিকশন পড়েন। আর গল্প, উপন্যাস সব ধরনের মানুষ পড়ে নিজেদের আনন্দের জন্য।’

মেলা ঘুরে অনেক পাঠককে দেখা গেল উপন্যাসের খোঁজ করছেন। পছন্দসই হলেই কিনছেন। অনেকে ঘুরছেন কেনার তালিকা নিয়ে, যার বেশিরভাগই উপন্যাস। অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে বই কিনতে আসা আরাফাত বলেন, “আমি হরিশংকর জলদাসের ‘হৃদয়নদী’ ও ‘এখন তুমি কেমন আছ’ উপন্যাস দুটি পড়েছিলাম। উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি। তাই এবারের বইয়ের লিস্টেও ওনার বই আছে, তাই কিনলাম।” অন্য এক পাঠকের হাতে দেখা যায় হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস সমগ্র। তিনি বলেন, ‘যেকোনো উপন্যাসের একটা পরিণতি থাকে। উপন্যাসে পুরো বিষয়কে পাঠকের সামনে হাজির করা হয়Ñ এটা উপন্যাসের বেশি বিক্রির একটা কারণ হতে পারে।’

নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার বইমেলার ১৯তম দিনে গল্পের বই এসেছে ৩৪টি, প্রবন্ধ ৭, কবিতা ৪৫, গবেষণা ৭, ছড়া ৫, জীবনী ১১, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ৪, বিজ্ঞান ২, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ১, স্বাস্থ্য ১, অনুবাদ ১, সায়েন্স ফিকশন ১ এবং অন্যান্য ৬টিসহ মোট ১৪২টি বই। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে গ্রন্থকুটির এনেছে সন্তোষ ঢালীর সামাজিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বই ‘মন না মতি’, শব্দশিল্প এনেছে আব্দুল লতিফের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘এক টুকরো স্বাধীনতার অংশ এবং সনদবিহীন মুক্তিযোদ্ধা’, পদক্ষেপ এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পগ্রন্থ ‘আমি কুকুর ভয় পাই’, অনার্য পাবলিকেন্স এনেছে তানভীর মোকাম্মেলের কবিতার বই ‘বেহুলা বাংলা ও অন্যান্য কবিতা’, অনন্যা এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের বই ‘একাত্তর ও একজন মা’।

লেখক বলছি : এদিন লেখক বলছি মঞ্চে প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে কথা বলেন পাঁচজন লেখক। আলোচনায় অংশ নেন মতীন্দ্র মানখিন, ফারুক মঈনউদ্দীন, ওবায়েদ আকাশ, রেজা ঘটক, আলতাফ শাহনেওয়াজ ও বদরুল হায়দার।

মূলমঞ্চ : বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন বড়–য়া। আলোচনায় অংশ নেন আলম তালুকদার, আসলাম সানী, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম ও আনজীর লিটন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি রবীন্দ্র গোপ, মতিন বৈরাগী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন রেজিনা ওয়ালী, এনামুল হক বাবু। এগনেস র‌্যাচেল প্যারিসের পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ ‘গীতিনাট্য’ পরিবেশন করে এবং শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুর ধারা সংগীতায়ন’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শারমিন সুলতানা, সুমন চন্দ্র দাস ও মো. জাকির হোসেন। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন অভিজিৎ রায় (তবলা), হোসেন আলী (বাঁশি), শ্যামাপ্রসাদ মজুমদার (কিবোর্ড) এবং এস এম তৌহিদ সরকার (দোতারা)।