বইমেলা কতদূর যাবে?

গত শুক্রবার বইমেলায় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য দুটো, এক মেলা দেখব, দুই আমার স্নেহভাজন দুই লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। মেলার ভেতরে গাড়ি ঢোকা নিষেধ। মোটামুটি দীর্ঘপথ পেরিয়ে ক্রমাগত মিছিলের মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত লেখকদ্বয়ের স্টলে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে মোড়ক উন্মোচনের মঞ্চে। প্রচন্ড ভিড়, সবচেয়ে বেশি ভিড় উন্মোচনের মঞ্চে। ভয় হচ্ছিল কখন মঞ্চটি ভেঙে পড়ে। সবচেয়ে বিব্রতকর ও বিরক্তিকর ছবি তোলা। সেলফোনে ক্যামেরা আসার পর থেকে ছবি তোলার হিড়িক ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। সবার হাতে একটা ফোন এবং একটা ক্যামেরা। ফোন আর যোগাযোগের মাধ্যম নেই, এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন ছবি তোলার যন্ত্র এবং একই সঙ্গে তা চলে যাচ্ছে ফেইসবুকে। সেই ছবি কতটা প্রয়োজনীয় তা দেখার অবকাশও নেই। অপ্রয়োজনীয় ছবির আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে ফেইসবুক।

যাক বইমেলায় সর্বত্রই ভিড়। শুক্রবার ছুটির দিন। অনেকেই এসেছে পরিবার-পরিজন নিয়ে। ফাগুনের হাওয়া বইছে সেই সঙ্গে, বসন্ত এসে গেছে। আমাদের চোখের সামনেই বইমেলার সূচনা এবং বেড়ে ওঠা। ছোট্ট বইমেলাটি এখন বিশাল সমুদ্রের মতো। সুসজ্জিত প্যাভিলিয়ন স্টল জমজমাট। প্রতিদিন প্রচুর বই বেরুচ্ছে। মাসের শেষ দিনটি পর্যন্ত বই প্রকাশ হতেই থাকবে। পাঠকরাও বই কিনতে থাকবে। যদিও যত মানুষ তত বই বিক্রি হচ্ছে না। সবসময়ই এই অবস্থা ছিল।

বছরের এ সময়ই প্রচুর বই বেরোয়, সারা বছর বইয়ের দোকানে তেমন ভিড় থাকে না। বই কেনার জন্য বইমেলার মতো কোনো বাজার নেই। মানুষের সহজগম্য কোনো বইপাড়া নেই কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের মতো। কলেজ স্ট্রিটের পরিসর কতটুকু তা দেখা যায় না। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণও দেখা যায় না। ভিড় সারা বছরই এই রকম। কোথাও লাইন দিয়ে বই কিনতে হয়। বইয়ের বিপণনকে কেন্দ্র করে একটা সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে সেখানে। সেখানেও নিত্যনতুন বই বেরুচ্ছে। মোড়ক উন্মোচনও হচ্ছে কিন্তু সেটা সারা বছর ধরে। এই রকম একমাসের জন্য নয়। এক মাসের জন্য এই বই বেরোনোর ফলে সারা বছরের লোকদের একটা প্রেরণার জায়গা দাঁড়ায় একুশের বইমেলা। প্রকাশকরাও সেভাবেই তৈরি হয়। পাঠকরাও ঐ একটি মাসেই বই কেনে। সারা বছর তারা বইয়ের খোঁজও করে না।

কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলেও চলবে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণন শুরু হয় কলকাতায়। কলেজ স্ট্রিটের প্রথম বইয়ের দোকানটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। সেই কলেজ স্ট্রিট আজকের এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকায় গুটিকয়েক বইয়ের দোকান ইসলামপুর, বাংলাবাজার এলাকায়। অবশ্য কলকাতারও প্রেস, কর্মচারী, বাইন্ডিং কর্মীরা ছিল মূলত মানিকগঞ্জ ও বিক্রমপুর এলাকার। দেশ বিভাগের পর তারা ঢাকায় চলে আসে এবং ইসলামপুর এলাকাটিই প্রেস পাড়া হিসেবে গড়ে ওঠে। মূলত পাঠ্যপুস্তকের প্রকাশকরাই অন্য বই প্রকাশ করতেন। কলকাতা থেকে বই আনা একটা পর্যায়ে বন্ধ হয়ে গেল। তখনই মূলত এখানে বই প্রকাশের বিষয়টি খুবই গুরুত্ব পেতে থাকে। বাংলাদেশর স্বাধীনতার পর এই শিল্প বিকশিত হতে থাকে। এখন বাজার বড় হচ্ছে। কিন্তু তা শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক হবে কেন? সারা বছরই মানুষ বই কিনবে এটাই তো স্বাভাবিক।

লাতিন আমেরিকায় দেখেছি বইয়ের কী বিরাট বাজার। অনেকে বলেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের যুগে বইয়ের বাজার সংকুচিত হবে। এটাও ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। বই শুধু দেখার জিনিস নয়, হাতে নেওয়ারও বিষয়। আমাদের দেশে অবশ্য জনসংখ্যার তুলনায় পাঠক কম। যে পরিমাণ পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ হয় তার মধ্য থেকে সে তুলনায় অপাঠ্য পুস্তকের সংখ্যা অনেক কম। সমান হবে না নিশ্চয়ই কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ আনুপাতিক হার থাকা উচিত। একবার বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে পাঠাগারের জরিপ করা হয়েছিল। সেখানে পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় বই থাকলেও বিভিন্ন জ্ঞানের বই, সৃজনশীল বইয়ের সংখ্যা  দেখা গেছে অনেক কম। শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়াও এর একটা বড় কারণ। পাঠাভ্যাসকে উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও কিছু বিষয় সংযোজিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থাটাই এত নিপীড়নমূলক যে লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর, আর বই পড়ার কোনো আগ্রহ থাকে না। শিশুদের পুস্তকের ওজন কমাবার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

কিশোর-যুবকদের সৃজনশীলতার একটা বড় জায়গা ছিল লিটল ম্যাগাজিন। এই লিটল ম্যাগাজিনের একটা বড় চর্চা শুরু হয়েছিল আমাদের এখানেও। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে তার সূচনা। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে তাতে ছেদ পড়ল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে গেল। তার প্রভাব পড়ল স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও আধাসরকারি সংস্থায়ও। সেই দুর্দিনে স্মরণ করতেই হয় বিখ্যাত ব্যাংকার যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছিলেন সেই লুৎফর রহমান সরকারকে, যিনি দুহাতে সাহায্য করতেন এই লিটল ম্যাগাজিনকে। এখন সেভাবে আর্থিক সাহায্য করার কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লেখক-শিক্ষক এবং চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, স্কুল তাকে একটা আকাশ দিয়েছিল। সেই আকাশটা এখন ছাত্রদের কাছে খুবই ছোট হয়ে গেছে। কোথাও হয়তো আকাশটা আর দেখাও যায় না। বই পড়ার আনন্দ সেখান থেকেই শুরু। বইমেলায় অনেক আনন্দ থাকে। প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়ে ওঠে, সুন্দর সুন্দর ছবি তোলা যায়। তবে বই পড়ার, অন্যকে পড়াবার আনন্দ তা যেন আবার ফিরে আসে।

লেখক : নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট