পুরান ঢাকার পাগলাঘণ্টি কি হুঁশ ফেরাবে

নয় বছর আগের নিমতলী ট্র্যাজেডি যদি একটা সতর্কসংকেত হয়ে থাকে, তাহলে চকবাজার ট্র্যাজেডি ঢাকাবাসীর জন্য চূড়ান্ত পাগলাঘণ্টি।  প্রশ্ন হলো, এতেও কি আমাদের হুঁশ ফিরবে? নাকি আমরা ‘কত রবি জ্বলে রে, কে বা আঁখি মেলে রে’ মন্ত্রে আবারও জেগে জেগে ঘুমাব! ইতিহাস যে নিষ্ঠুর এবং ক্ষমাহীন চকবাজার ট্র্যাজেডি আক্ষরিক অর্থেই যেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সর্বগ্রাসী আগুনের এই লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল কত প্রাণ, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল কত মানুষের স্বপ্নের সংসার, বাড়িঘর, আশ্রয়, সহায়-সম্বল। কত শত মানুষ আগুনে পোড়ার গুরুতর ক্ষত আর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে পার করবে বাকিটা জীবন।  নিমতলী আর চকবাজার থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি এখনই ঐতিহাসিক এই নগরকে রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নিই, তাহলে জীবন আমাদের ক্ষমা করবে না। 

পুরান ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। মানুষই যেখানে দিবারাত্রি গাদাগাদি করে দেয়ালে-দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসবাস করছে, সেখানে মারাত্মক দাহ্য রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের কারখানা ও গুদাম এত বছর ধরে কীভাবে রয়ে গেল, সেটাই আমাদের অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকার প্রমাণ।  হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে পুরান ঢাকা থেকে তালিকাভুক্ত যে ৮০০ রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার কথা, তা আজও হয়নি।  নিমতলী ট্র্যাজেডির পর অনেক টালবাহানা শেষে গত অক্টোবরে একটা ‘রাসায়নিক পল্লী’ স্থাপনের চূড়ান্ত প্রকল্প অনুমোদিত হয় এবং গত মাসের শুরুতে সেই প্রকল্পে একজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বিসিকের অধীন ২০২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের জন্য এখনো জমি অধিগ্রহণও হয়নি।  নিমতলীর পর নয় বছরে এইটুকুই অগ্রগতি।

শত দুর্ঘটনাতেও আমাদের কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শত অজুহাত। তাই মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী-রাজনীতিক আর আইনকানুনের ফাঁকফোকরে ফেলে সবই পার করে দেওয়ার অসাধু আমলাতান্ত্রিক চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে নিরপরাধ নিরাপত্তাহীন নগরবাসীর ভাগ্য। এ কারণেই সম্ভবত এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দিতে কিংবা ঘটনাস্থলে কোনো রাসায়নিকের অস্তিত্বই ছিল না বলে দিতে আমাদের মন্ত্রী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের আটকায় না। কিন্তু শত বছরের অব্যবস্থাপনা আর পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের শিকার পুরান ঢাকাবাসীর ভাগ্য তো ওই বুড়িগঙ্গাতীরের মাটিতেই আটকে আছে। অবশ্য বেপরোয়াভাবে গড়ে ওঠা আজকের নতুন ঢাকার বেশিরভাগ অঞ্চলকেও নিরাপদ আবাসনের প্রশ্নে এর চেয়ে খুব বেশি আলাদা করার সুযোগ নেই। মোহাম্মদপুরে ভূগর্ভস্থ গ্যাস সরবরাহ লাইন ফেটে গাড়িতে আগুন লাগার ঘটনাকেও তাই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগরগুলোর একটি।  ঐতিহাসিক এই নগরে এখন প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের বসবাস।  প্রায়শই নানা জরিপে আমরা একে বসবাসের জন্য সবচেয়ে অযোগ্য, বায়ু দূষণের শহর, সবচেয়ে বিশৃঙ্খল গণপরিবহনের শহর এমন অভিধা পেতে দেখি।  কিন্তু সবই যেন আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ংকর পরিস্থিতি কিন্তু বজায় রয়েছে আমাদের ভবন নির্মাণ নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে।  নানা গবেষণায় বলা হচ্ছে, ঢাকার প্রায় ৮০ ভাগ দালানকোঠাই ‘বিল্ডিং কোড’ মেনে তৈরি হয়নি।  বাড়ি বানানোর সময় প্রায় কেউই মানছেন না ‘ফায়ার কোড’।  ১৯৯৩ সালে প্রথম ফায়ার কোড প্রণয়ন করা হলেও জাতীয় সংসদে তা আইনে পরিণত হয় ১৩ বছর পর ২০০৬ সালে। ২০১৫ সালে তা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। ঢাকায় কয়েক দশকে এত এত মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের পরও আমাদের সচেতনতা এতটুকুই।

ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও মারাত্মক ভবনধসের অনেকগুলো বড় দৃষ্টান্ত নিকট অতীতেই রয়েছে। আর আমাদের সামনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে মারাত্মক ভূমিকম্পের। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে এইসব নাগরিক দুর্যোগের পার্থক্য এই যে, আমাদের নিয়তিটা এখানে অনেকটাই জানা। এই নগরে বিল্ডিং কোড কিংবা ফায়ার কোড না মানার কারণে কারোরই শাস্তি হতে দেখি না আমরা। আর নগর পরিকল্পনার কিংবা নগর সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগও আমাদের চোখে পড়ে না।  কিন্তু আমাদের অবশ্যই এই অগস্ত্যযাত্রার রাশ টানতে হবে। যত দ্রুত আমরা সেই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারব দেশবাসীর জন্য ততই মঙ্গল।