অজ্ঞাত রোগে ১৫ দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যুর আলোচিত ঘটনায় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের ভান্ডার দহ মরিচপাড়া গ্রামের আবু তাহেরের বাড়ি পরিদর্শন করেছে ঢাকা থেকে আসা রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ৫ সদস্যের অনুসন্ধানী টিম।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ৫ সদস্য তদন্ত টিমের নেতৃত্ব দেন- ডা. গাজি শাহ আলম। অন্য সদস্যরা হলেন-ডা. তানজিনা নওরীন, ডা.দেবাশীষ কুমার শাহ, ডা.শাহনাজ পারভীন ও ডা.ইসমাইল খান।
বুধবার মেডিকেল টিম মৃত ওই পরিবারের বাড়িতে মেডিকেল টিম পৌঁছানোর পর ওই পরিবারের আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেন এবং আবু তাহেরের বাড়ির ৪টি কক্ষ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঠাকুরগাঁও ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন শাহজাহান নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ৫ সদস্যের অনুসন্ধানী মেডিকেল টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেছেন। রংপুরে আক্রান্ত ৩জনের নমুনা নিয়েছেন।
রাজশাহী থেকে আরো একটি মেডিকেল টিম ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন। দুটো মেডিকেল টিমই ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ দিন অবস্থান করবে। সংগৃহীত নমুনা ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
ঢাকা থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন আসলেই ৫ জনের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে এলাকার লোকজন বলছেন, ঘটনাটি কোন ভাইরাস জনিত কারণ নয়। আবু তাহের পেশাগত কবিরাজ ছিলেন। দেবী-দেবতার পূজা করে আসতেন। পূজায় সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রথমে তার মৃত্যু এবং পরে ধীরে ধীরে তার পরিবারের লোকজন মারা গেছেন বলে এলাকার লোকজন কুসংস্কার ছড়াচ্ছে।
এদিকে এ পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আক্রান্ত এলাকার ১ কিলোমিটারে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ মুখে মার্কস পড়ে চলাফেরা এবং স্থানীয় দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জন্য বন্ধ করে দেয়।
তবে এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ফিরে আসায় সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে উপজেলা প্রশাসন। একদিন বিদ্যালয় দুটি বন্ধ থাকার পর বুধবার খুলেছে বিদ্যালয় দুটি।
ওই এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের মাঝে আর তেমন আতঙ্ক দেখা যায়নি। এখন কোন আতঙ্ক নেই বলে জানায় স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে গত রবিবার অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত সালমাকে বুধবার ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। রবিবারে আক্রান্ত সালমা বলেন, সেদিন গোটা শরীর ভারী হয়ে উঠেছিল। জ্বর ও ব্যথা অনুভব করেছি। স্থানীয় মাহাত(করিবাজের) পানিপড়া খেয়ে এখন সুস্থ বলে জানায় সালমা বেগম।
ওই গ্রামের নুরজাহান বেগম জানায়, আবু তাহেরের স্ত্রী হোসনে আরা মারা যাওয়ার পর মৃতদেহ গোসল করে দিয়েছি। যদি ভাইরাস হতো তবে আমাকেও আক্রান্ত করত। কিন্তু আমার তেমন কিছু হয়নি। নুরজাহান ভালো আছে বলে জানায়।
ভান্ডার দহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী জিনিয়া কবির রুমা জানায়, মঙ্গলবার স্কুল বন্ধ ছিল। বুধবার সকাল থেকে স্কুল খুলেছে ক্লাস করেছি।
মৃত তাহেরের স্বজন আকতারুল ইসলাম জানায়, মৃত দেহ গোসল করানোর সময় দেখেছি, গলা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো বর্ণের ছিল। মুখের ভেতর জিহ্বাও কালো ছিল। এসব রোগ নয় বলে দাবি করেন তাহেরের স্বজন আকতারুল ।
ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সমর কুমার চ্যাটার্জি বলেন, এখন আর মানুষের মনে আতঙ্ক নেই। স্বাভাবিক ভাবে মানুষ চলাচল করছে।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান মাসুদ জানান, এলাকার পরিবেশ এখন ভালো। স্কুল দুটি একদিন বন্ধ থাকার পর বুধবার থেকে খেলা। যেহেতু এখন মানুষের মনে আতঙ্ক নেই। তাই মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করছে।
উল্লেখ যে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত রোগে ভান্ডার দহ মরিচপাড়া গ্রামের ফজর আলীর ছেলে আবু তাহের (৫৫) মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি একই দিনে মারা যান আবু তাহেরের জামাতা হাবিবুর রহমান (৩৫) ও স্ত্রী হোসনে আরা (৪৫)। এর দুই দিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি আবু তাহেরের দুই ছেলে ইউসুফ আলী (৩০) ও মেহেদি হাসান মৃত্যুবরণ ও ওই পরিবারের ৩ জন অসুস্থ হলে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।