প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের সদস্য দিদারুল আলম এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদক নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদক সেবন, ব্যবসা ও সরবরাহ একটি অপরাধ। এটি বোঝানোর ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা এসেছে। মাদকসেবীদের নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা ও কাউন্সিলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা যাতে মাদক সেবন ছেড়ে দেয় সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদের মতো মাদকের বিরুদ্ধেও সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের মাটিতে যেমন জঙ্গিবাদ শেকড় গাড়তে পারেনি, তেমনি মাদকও নিয়ন্ত্রণে আসবে। সংসদ সদস্যদেরও নিজ নিজ এলাকায় কেউ যাতে মাদকাসক্ত না হয়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। অন্য যারা জনপ্রতিনিধি রয়েছেন তাদেরও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সচেষ্ট থাকতে হবে। মাদক ব্যবহার, বিক্রি বা বহন করা এগুলো যে অপরাধ, জনগণ এ ব্যাপারে এখন যথেষ্ট সচেতন। সরকার যাদের আত্মসমর্পণ করাচ্ছে (মাদক ব্যবসায়ী), তাদের চিকিৎসা ও কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মাদক থেকে দূরে রাখার পদক্ষেপ নিয়েছি। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা অন্য কোনো ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে ভালোভাবে চলতে পারে। এভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে। আমরা যখনই সরকারে আসি তখনই গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর জোর দিই। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে বিআরটিসিসহ গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ বিআরটিসি লাভজনক নয়। আমরা ক্ষমতায় এসে আবার বিআরটিসিকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিই। আমরা ক্ষমতায় এসে অনেকগুলো বিআরটিসি বাস ক্রয় করি। কিন্তু আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত তিন থেকে চারশ’ বিআরটিসির বাস পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই আমরা গণপরিবহন যত বেশি চালু করতে পারি সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, বিশ্বের সব দেশেই ট্রাফিক সমস্যা আছে। লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বড় দেশেরও এ সমস্যা রয়েছে। কারণ জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গাড়ি ব্যবহারের সংখ্যাও বাড়ছে। ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা ও ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটা চালু হলে যানজট নিরসন আরও কার্যকর হবে।
মুজিবুল হক চুন্নুর অপর প্রশ্নের জবাবে দেশের সকল গ্রামকে শহরের সুযোগ সুবিধা দিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। কৃষিজ ও অকৃষিজ উভয় ক্ষেত্রে কর্মকা- বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে গ্রামীণ পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অকৃষি খাতের অবদান বেড়ে চলেছে। স্যাটেলাইটের সেবার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর মাধ্যমে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল তাদের সম্প্রচার কাজ সম্পন্ন করছে। ডাইরেক্ট টু হোম সার্ভিসের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি চ্যানেল অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চারটি টিভি, সমুদ্রগামী বাণিজ্যক জাহাজ ও মৎস্য আহরণকারী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, ই-লার্নিং, টেলিমেডিসিন, ই-কৃষির মতো নতুন নতুন সেবা দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আপৎকালীন নিরবিচ্ছিন্ন টেলিকমিউনিকেশন সেবা, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধাসহ চিকিৎসাসেবা নেওয়া যাবে। এরই মধ্যে আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রাপ্তির সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোই বছরে প্রায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়ে আসছে। এছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বিদেশি স্যাটেলাইট থেকে ভাড়ায় সেবা নিয়ে আসছে। এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিরাট অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জঙ্গিবাদ নির্মূল সংক্রান্ত বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের অপারেশনাল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্পেশালাইজড নতুন ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) গঠন, বাহিনীর সদস্যদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তকরণের সুবিধার্থে হ্যালো সিটি, রিপোর্ট টু র্যাব প্রভৃতি অনলাইন অ্যাপস চালু করা হয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত, সাজাপ্রাপ্ত ও আটক জঙ্গিদের নিবিড় নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।