গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব উদ্বেগজনক

দেশের সাতটি গ্যাস উৎপাদন কোম্পানি নিজেদের তারল্য ঘাটতি মেটানো এবং মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর অভিন্ন প্রস্তাব করেছে। উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা এলএনজি বা ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’-এর দামের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের নতুন বিক্রয়মূল্য ১২ টাকা ১৯ পয়সা নির্ধারণ করার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে এই প্রস্তাব করেছে কোম্পানিগুলো। এতে শিল্প, বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সার উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের, প্রায় ১৫৮ শতাংশ। কিন্তু কেবল শিল্প খাতেই নয়, যানবাহনে ব্যবহৃত ‘সিএনজি’ এবং আবাসিক সংযোগেও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে কোম্পানিগুলো; যা দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

পাইপলাইনে সরবরাহকৃত আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিগত বছরগুলোতে দেশে এলপিজি বা ‘তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস’-এর ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন আবাসিক খাতে ব্যবহারের জন্য আর পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না।  ৬০টি কোম্পানিকে প্রাথমিকভাবে ‘এলপিজি’ আমদানি ও বোতলজাত করার অনুমতি দেওয়া হলেও ২২টি কোম্পানি এলিপিজি বিপণন কাজে নিয়োজিত থেকে বার্ষিক ৭ লাখ ৭৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করছে। এদিকে, রবিবার ‘সাউথ এশিয়া এলপিজি সামিট ২০১৯’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের একচেটিয়া ব্যবসা রোধ করতে সরকারি খাতের কোম্পানি ‘এলপি গ্যাস লিমিটেড’কে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরবরাহের গ্যাসের চেয়ে এই এলপিজি গ্যাসের দাম বেশি হওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এলপিজির দাম কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে দেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নেতারা বলেছেন, এতে করে দেশে নতুন বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং এর ফলে বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। পাশাপাশি এতে করে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সে রকম কিছু ঘটলে তা সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, আবাসিক গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে ‘এক চুলা’ ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টাকা এবং ‘দুই চুলা’ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে যানবাহনের ব্যবহৃত ‘সিএনজি’ গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবে ঘরে-বাইরে সবখানেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বা চাপের মধ্যে পড়বেন দেশের সাধারণ নাগরিকরা। কেননা, মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় বাড়িভাড়া আর গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির মতো নাগরিক পরিষেবাগুলোর বিল দিতে দিতে।  একদিকে আবাসিক সংযোগে গ্যাসের দাম বাড়া এবং এলপিজি গ্যাসের দাম না কমা দুয়েরই প্রাথমিক শিকার হবে এই মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষেরা। অন্যদিকে, যানবাহনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়া এবং উৎপাদিত শিল্পপণ্যের দাম বাড়ার ধকলও বইতে হবে এই সাধারণ মানুষকেই। কারণ এ সবই সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং এর মূল্যস্ফীতির মতো অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে আগামী ১১ থেকে ১৪ মার্চ গণশুনানির আয়োজন করবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু আসলে এমন গণশুনানিতে জনগণের কথা কতটা শোনা যায় তা বরাবরই প্রশ্নসাপেক্ষ। ভোক্তা অধিকার, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও দাম না বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার তা হলো সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবার দাম মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকলে কিংবা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকটের মধ্যে পড়ে গেলে অর্থনীতির অগ্রগতি যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি জনগণের সামাজিক জীবনমানেরও অবনতি ঘটবে। ফলে, গ্যাসের দাম বাড়ানো, বিশেষত আবাসিক সংযোগে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা উচিত।