কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসার হার বাড়ছে

উত্তরের দারিদ্র্য ঢাকায়

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার নুরুল ইসলাম (৫৫) রাজধানীতে রিকশা চালান প্রায় ১০ বছর ধরে। থাকেন মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের একটি রিকশা গ্যারেজে। গ্রামে থাকতে টুকটাক চাষাবাদের পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ করতেন। নিয়মিত কাজ না পাওয়া ও সস্তা মজুরির কারণে সংসার চালাতে বেগ পেতে হতো। ২০০৭ সালে হঠাৎ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় পড়েন আরও বিপদে। এরপরই নতুন কর্মের সন্ধানে চলে আসেন ঢাকায়। শুধু নুরুলই নন, গত কয়েক বছরে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে কর্মের সন্ধানে রাজধানীতে আসার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মূলত কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষিতে লোকসান, ঋণ পরিশোধের তাগিদ ও যৌতুকের অর্থ পরিশোধের তাড়না তাদের ঢাকামুখী করছে।

দেশ রূপান্তরকে নুরুল জানান, দুই বছর আগে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আসবাবপত্র বাবদ খরচ হয়েছে আরও ৩০ হাজার। টাকা জোগাতে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া একমাত্র সম্বল ৫ কাঠা আবাদি জমি বিক্রি, এনজিও থেকে ঋণ ও পরিচিতজনদের কাছে ধার করেন। সব মিলিয়ে ৭০ হাজার টাকা দেনাগ্রস্ত নুরুল। একজনের ঋণ পরিশোধে আশ্রয় নিতে হচ্ছে আরেকজনের।

এ অবস্থাতেই ছোট মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে মেয়ের বিয়ে- নুরুল পড়েছেন নতুন সংকটে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডের রূপায়ণ জেড আর প্লাজার সামনে নুরুলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির শিকারের বর্ণনা দেন দিনাজপুরের নজরুল, জোনাব আলী; নওগাঁর মোতালেব, তাহের, রমজান; গাইবান্ধার শাহজাহান, সাজু; বগুড়ার আব্দুল্লাহ, জাকারিয়া; রংপুরের রফিকুল, সোলেমানরা। এরা পেশায় সবাই রিকশাচালক।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে লাইসেন্স করা রিকশার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৪০০। তবে গুলিস্তানে অবস্থিত জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও ওপরে। যার বড় অংশ কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা সোসাইটির নামে অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। রাজধানীতে রিকশাচালকের সংখ্যা চার লাখেরও বেশি বলে জানান ইনসুর আলী। তিনি জানান, অনেক রিকশাওয়ালা মৌসুম ভিত্তিতে দু-তিন মাসের জন্য আসেন ঢাকায়।

বিপুলসংখ্যক রিকশাচালক কোনো জেলা থেকে বেশি আসছেন এবং কেন আসছেন? এই দুটি প্রশ্নকে সামনে রেখে গত দুই মাসে রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, গাবতলী, শাহবাগ, বাংলামোটর, মগবাজার, মৌচাক, রায়েরবাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকার প্রায় ৩০০ রিকশাওয়ালার সাক্ষাৎকার নেন এই প্রতিবেদক। সেখানে দেখা গেছে, এদের ২৬৯ জনই রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, রাজশাহী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারীসহ উত্তরের জেলাগুলো থেকে আসা। বাকি ৩১ জন জামালপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, বরিশাল, ফরিদপুর অঞ্চল ও ঢাকার একটি উপজেলা থেকে রিকশা চালাতে এসেছেন।

এদের সবাই এই পেশায় আসার পেছনে যেসব কারণ বলেছেন তা প্রায় একই ধরনের। নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব, দরিদ্রতা, যৌতুক, এনজিওর ঋণ, কৃষিপণ্যের নিম্নমূল্য, নিম্ন মজুরি, স্থানীয় মহাজন শ্রেণির কাছে চড়া সুদের ঋণের ঘটনা তুলে ধরেছেন সবাই। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপেও বিষয়টির সত্যতা মিলছে। গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত জরিপে বিবিএস জানায়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। বিবিএসের হিসাবে কম দরিদ্র এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপে এই তিন বিভাগের মাত্র একজন রিকশাচালক পাওয়া যায়।

দিনাজপুর ও রংপুরের কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধানের চাষ করে উৎপাদন খরচ উঠছে না। আল্,ু পটোল, মুলা, বেগুনসহ প্রায় সব কৃষিপণ্যের অবস্থা একই। রংপুরের তরুণ কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের দাম নাই, সার-তেল-বীজ, লেবার খরচ সবই বাড়ছে। গতবার ম্যালা আম হইল বাগানোত, দাম নাই, বেচাও হয় নাই। গাছের আম গাছেই পচে গেল। শুনি, ঢাকা, চিটাগাঙ্গত নাকি আমের দাম ম্যালা, কেউ তো আইল না আম নিবা!’

দিনাজপুরের কয়েকজন কৃষক জানান, ধাননির্ভর এ জেলার কৃষকের এখন মরণদশা। সরকার আইন করে যৌতুক নিষিদ্ধ করলেও এই অঞ্চলে এর প্রভাব পড়েনি। দিনমজুর ছেলের সঙ্গেও মেয়ে বিয়ে দিতে গেলে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা যৌতুক দিতে হয়। এ ছাড়া ছেলেমেয়ের চাকরির জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এসব অর্থের জোগান দিতে গিয়ে জমি বিক্রি, এনজিও বা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিতে হয়। ঋণের টাকা পরিশোধ ও এলাকায় যুতসই কর্মসংস্থানের অভাবে ঢাকায় এসে রিকশা চালানো বা মিস্ত্রির কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন এসব জেলার মানুষ। নওগাঁর বেলাল হোসেন বলেন, ‘ধান কাটা আর রাইচ মিলত কাম ছাড়া হামরা কাম পাইনে। সরকার হামাক কামের ব্যবস্থা করি দেউক, মিল ফ্যাক্টরি করি দেউক, তাহিলে হামরা ঢাকাত আসপে নাই।’

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক আখ্যা দেন। এ প্রক্রিয়াকে দরিদ্র মাইগ্রেশন হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘উত্তরের জেলাগুলোতে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন উদ্যোগে সরকারের উৎসাহ নেই। দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল হলেও উত্তরে হচ্ছে না। এটা হতাশাজনক। বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল করে করছাড় দিয়ে হলেও উত্তরাঞ্চলে বিনিয়োগ আনা দরকার। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন অবকাঠামো নির্মাণ।’