ফের নির্বাচন চান বিজয়ী নুর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ফল বর্জন ও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে একাট্টা ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি ছয় প্যানেল। নির্বাচনে কোটা আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরকে নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছয় প্যানেলের নেতারা আলোচনা করে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল দিনভর আলোচনায় ছিলেন নুর ও ছাত্রলীগের পরাজিত ভিপি প্রার্থী সৈয়দ রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচন ও হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল রাতে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন রোকেয়া হলের ছাত্রীরা।

এদিকে সকাল থেকেই ছাত্রলীগ ভিসির বাসার সামনে ভিপি ও সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানায়। সেখানে ভিপি পদে ছাত্রলীগের পরাজিত প্রার্থী শোভন-সমর্থিত গ্রুপ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। বেলা ৩টায় শোভন সেখানে যান এবং এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ ব্যাপারে শোভন রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ^বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা যেন কোনোভাবেই খর্ব না হয়, এটাই সবার প্রতি আমার প্রত্যাশা।’ আজ দুপুর ১২টায় ফল বাতিল করে পুনঃ তফসিলের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে ঢাবি উপাচার্য বরাবর লিখিত আবেদন দেবেন তারা। এরপর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেবে ভোট বর্জনকারী পাঁচটি প্যানেল। এজন্য তিন দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হবে। এতে কাজ না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সামাদ বলেন, পুনর্নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনও হয়ে গেছে। ফলও ঘোষণা হয়ে গেছে। ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলবে সব। বর্জনকারীরা মনে করে, ডাকসু নিয়ে তাদের পরবর্তী কর্মসূচির বেশিরভাগই নির্ভর করে নুরের সিদ্ধান্তের ওপর। আবার এই নির্বাচনে জিএসসহ ২৩ পদে নির্বাচিত হয়েও ছাত্রলীগ শঙ্কায় নুরকে নিয়েই।

এর আগে বিকেলে ছাত্রলীগ প্যানেলের পরাজিত ভিপি প্রার্থী শোভন ফল মেনে নিয়ে টিএসসিতে নুরের সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানাতে গেলে নুর তাৎক্ষণিকভাবে চলমান ধর্মঘট কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা বলেন। তিনিও শোভনকে বলেন, মিলেমিশে কাজ করতে তাদেরও আপত্তি নেই। তিনি এ সময় শপথ নেওয়ার বিষয়েও অনেকটাই ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তবে শোভন চলে যাওয়ার পরই নুর গণমাধ্যমে বলেন, ‘গতকালও (সোমবার) ছাত্রলীগ রোকেয়া হলে আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। এমনকি দুপুরেও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা করে। ওদের মুখে মধু বুকে বিষ। তাদের আমি বিশ^াস করি না। আমি পুনর্নির্বাচনের দাবিতে অটল আছি।’ জানা গেছে, বিকেলে নুর ও শোভনের কোলাকুলি ও অভিনন্দন বিনিময়ের পর পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে নুর শপথ নেবেন, ফল মেনে নিয়েছেন এবং ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোট বর্জনকারী পাঁচ প্যানেলের নেতারা সন্ধ্যায় বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে উপস্থিত বাম জোটের একজন নেতা জানান, বৈঠকে প্যানেলের সবাই নুর এবং একই প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে পদত্যাগ করার কথা বলেন। তারা নুরের বক্তব্য জানতে চান। এ সময় নুর বলেন, তিনি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলবেন নির্বাচনে কতটা অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। নির্বাচনের আসল ফল কী হতো সেটি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নির্বাচন বাতিলের যুক্তি ও দাবি তুলে ধরবেন।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগ নুরকে দলে ভেড়াতে চাইছেনÑ এ রকম আশঙ্কা রয়েছে বর্জনকারী জোটের। বিষয়টি নুরও জানেন। তারা বলেন, নুর কারচুপি, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ করতে চান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে। তিনি গণভবনে

 প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হতে চান। নুরের প্যানেলের পরাজিত জিএস প্রার্থী রাশেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুরকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে। সে খ্বুই অসুস্থ। আমরা জোটগতভাবে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি নির্বাচন বাতিলের জন্য আল্টিমেটাম দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘নুরকে নিয়ে এখন ছাত্রলীগ টানাহ্যাঁচড়া করছে। শোভন দেখা করেছেÑ এটা একটা সৌজন্যতা। অথচ তারা বেরিয়ে বলছে, নুর বলেছে সে তাদের সঙ্গে কাজ করবে। আমরা নতুন নির্বাচন চাই।’

এর আগে ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুর দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি ভিপি হয়েছেন এটা কোনো বড় বিষয় নয়। ডাকসুর মর্যাদা রক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার অক্ষুণœ রাখতে যা করা উচিত তিনি তা-ই করবেন। গতকাল রাত ৮টার পর থেকেই নুরের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। রাশেদ খান বলেন, তিনি বাসায় চলে গেছেন। তিনিও নুরের নম্বর বন্ধ পাচ্ছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বর্জনকারী বাম জোট প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী জানান, বর্জনকারী প্যানেলের বৈঠকে নুরসহ সবাই ডাকসুর পুনর্র্নির্বাচন চান। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে পুনর্র্নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিরপেক্ষ শিক্ষকদের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে নুর বলেছেন, পুনর্র্নির্বাচন হলে সবগুলো পদেই হতে হবে। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা অন্যান্য সংগঠন এ বিষয়ে যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাতে পূর্ণ সমর্থন থাকবে বলেও জানান ডাকসু ভিপি।

গতকাল সকালে নুর ঢাবি ক্যাম্পাসে গেলে টিএসসি এলাকায় তাকে ধাওয়া করে ছাত্রলীগ। নুরকে রক্ষা করতে গিয়ে হামলায় আহত হন ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সমাজসেবা সম্পাদক প্রার্থী তৌহিদুর রহমান। এরপর নুর ও তার সঙ্গীরা টিএসসির ভেতরে অবস্থান নিলে বিকেলে সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও ভিপি পদে পরাজিত প্রার্থী শোভন।

টিএসসিতে পৌঁছেই নুরকে জড়িয়ে ধরেন শোভন। এ সময় নুর বলেন, ‘তিনি স্বাগত জানাতে এসেছেন। অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমিও তাকে স্বাগত জানিয়েছি। ছাত্রলীগ সভাপতি বলেছেন তারা আমাদের সাথে একসাথে কাজ করতে চান। আমরাও একসাথে কাজ করতে আগ্রহী।’

নুর আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম একটা দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন হোক। কিন্তু বিভিন্ন অনিয়ম কারচুপির কারণে আমাদের সেই আশা পূরণ হয়নি।’

ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এবারের মতো ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৩ সালে। তখন ডাকসু নির্বাচন হওয়ারর পরেও ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। পরে আর ভোট গণনাই হয়নি। সেই নির্বাচনের কোনো ফলাফলও হয়নি। এরপরে আর ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। এত বছর পরে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে এত অনিয়মের ঘটনা ঘটল। তিনি বলেন, ‘আন্দোলন-কর্মসূচির ঘোষণা না দেওয়া হলে ভিপি হিসেবে নুরুল হকের পদটিও দেওয়া হতো না। শুধু আন্দোলনের মুখে নুরুল হকের পদটি তারা নিতে পারেনি।’ মাহমুদুর রহমান বলছেন, ‘আমি এটাকে নির্বাচন বলব না, এটা হচ্ছে কারও কারও ইচ্ছাপূরণের ব্যাপার।’ গভীর রাতে রোকেয়া হলে বিক্ষোভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচন ও হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন রোকেয়া হলের ছাত্রীরা। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু করে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হলের ভেতরে বিক্ষোভ মিছিল করছিলেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোকেয়া হলের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকসু আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য। কিন্তু এই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। এই হলেও অনিয়ম হয়েছে। তাই আমরা ডাকসুর পুনর্নির্বাচন এবং এই হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ চাই।’ এ বিষয়ে জানতে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সোমবার ডাকসু নির্বাচন চলাকালে রোকেয়া হলে ছাত্রলীগ বাদে অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, ভোটগ্রহণ শুরুর আগে তাদের খালি ব্যালট বাক্স দেখানো হয়নি। তিনটি ব্যালট বাক্সের হদিস তারা পাচ্ছেন না। এরপর দুপুরে হলের ভোটগ্রহণ কক্ষের পেছনে আরেকটি কক্ষে ব্যালট পেপার বোঝাই ট্রাঙ্ক পাওয়া গেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কারচুপির অভিযোগ এনে তা ছিনিয়ে নিয়ে যান। ওই ঘটনায় তিন ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে।