নুরের নরম সুর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন বাতিল এবং পুনঃতফসিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এদিকে ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি পাঁচ প্যানেলের পুনঃতফসিলসহ চার দাবিতে দেওয়া আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে কাল। এরই মধ্যে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর।

ওদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাকসুতে বিজয়ীদের আগামীকাল শনিবার বিকেল ৪টায় গণভবনে ডেকেছেন বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। এ ব্যাপারে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবার প্রধানমন্ত্রী। তিনি ডাকসু ও হল সংসদে বিজয়ী সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন। আমাদের সবার দায়িত্ব সেখানে যাওয়া। একইভাবে ডাকসুর নবনির্বাচিত জিএস ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ডাকসু ও হল সংসদে আমরা যারা ছাত্রলীগ থেকে বিজয়ী হয়েছি, তারা সবাই শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। 

ঢাবি প্রশাসন ও বর্জনকারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই বৈঠক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র বলছে, ওই বৈঠকে নুরকে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করার অনুরোধ করা হয়েছে। নুরও তার কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসছেন।

নুরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নুর সবসময়ই বলে আসছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে। তারা যদি পদত্যাগ করতে বলে তাহলে করবে। তিনি বলেন, ভিপি পদে বহাল থেকেও আন্দোলন করা যায়। আমরা চাই পুনর্নির্বাচন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতও নেওয়া হবে। তবে শিক্ষার্থীরা চাইলে ভিপি পদে থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।

নুর শেষ পর্যন্ত কী করবেনÑ এ প্রশ্নই গতকাল ঘুরপাক খাচ্ছিল ক্যাম্পাসে। এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের প্যানেলগুলোর সঙ্গে নুরের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের নেতাকর্মীদের আলোচনা হয়।

 নির্বাচন বাতিল না করলে তাদের কর্মসূচি কী হবে?

গতকাল রাতে ঢাবি ভিসি আখতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন বাতিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সময়মতো অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা হবে।

প্রগতিশীল বামজোটের ভিপি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, শনিবারের পর আমরা আবার কর্মসূচি দেব। আমরা এই নির্বাচন মানি না। নুরের নমনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো এরকম কোনো কিছু ঘটেনি।

এদিকে গতকাল প্রথমবারের পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে ছাত্রলীগ বাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সংগঠনগুলো। ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ডাকসু নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে ছাত্রদল, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, স্বতন্ত্র জোটসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকলেও ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্য ছাত্রসংগঠনকে বাদ দিয়ে একাই নির্বাচন করে।

নির্বাচনের পরদিন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সকাল থেকেই আন্দোলনে নামে নির্বাচন বর্জনকারী পাঁচটি প্যানেল। তারা শনিবারের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য আল্টিমেটাম দেয়। ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে মঙ্গলবার রাজু ভাস্কর্যে অনশনে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী। এখনো তারা অনশন ভাঙেননি। অন্যদিকে একই দাবিতে রোকেয়া হলের সামনে বুধবার অনশনে বসেন পাঁচ ছাত্রী। তারাও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সংগঠনগুলো ডাকসুর পুনর্নির্বাচন দাবি করায় এখন ছাত্রলীগ বাদে সব ছাত্রসংগঠনই পুনর্নির্বাচনের দাবিতে একমত।

জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি আহসান হাবীব শামীম সাংবাদিকদের বলেন, এটা একটা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। এ ধরনের নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চায়নি।

গতকাল দুপুর আড়াইটা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অফিসকক্ষে নুরের সঙ্গে আলোচনা হয়। বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে ভিপি নুরুল হক নুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোকেয়া হলের মেয়েরা হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ, ডাকসুর পুনর্নির্বাচন, মামলা প্রত্যাহারসহ যে দাবিগুলো নিয়ে অনশন করছে সেগুলো যেন দ্রুত মানা হয় সে বিষয়ে কথা বলেছি। এছাড়া প্রশ্নফাঁসে অনেকে জড়িত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ঘোরাফেরা করছে। সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ ব্যাপারে কোনো আশ্বাস দেননি। নির্বাচন বাতিল না হলে ভিপি পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কি নাÑ এই প্রশ্নে নুর বলেন, আগেও বলেছি এখনো বলছি, জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই ঘোষণা দেব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি সবসময়ই আছি এবং থাকব।

ঢাবিতে অনশন অব্যাহত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচন দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো রাজু ভাস্কর্যের সামনে অনশন অব্যাহত রেখেছে আন্দোলনকারীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গতকাল দিনভর সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান করেছেন। অনশনকারীরা জানান, ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাই তাদের দাবি, এ নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে সুষ্ঠু পরিবেশে পুনর্নির্বাচন দিতে হবে এবং ভোট ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ভিসি, প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পুনঃতফসিল ঘোষণার আগেই পদত্যাগ করতে হবে।

অনশনরত আটজনের মধ্যে অনিন্দ্য মণ্ডল অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অনশনকারীরা বলছেন, লাশ হলেও তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। কোনো ভয়ভীতির কাছে মাথা নত করবেন না। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের দাবি আদায়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অনশনকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন বাড়ছে বলে দাবি তাদের। গতকাল দিনভর অনশনকারীরা রাস্তার ছিলেন। তাদের নিরাপত্তায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষার্থীরা।

রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন ও হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে পাঁচ শিক্ষার্থী বুধবার রাত থেকে রোকেয়া হলের ফটকে অনশনে বসেন। অনশনরত পাঁচ শিক্ষার্থী হলেন জয়ন্তী রায়না, সায়েদা আফরিন শফি, প্রমি খীষা, রাফিয়া সুলতানা, শ্রবণা শফিক দীপ্তি। গতকাল তাদের বেশিরভাগই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে ছিলেন। রাস্তার ধুলাবালিতে তাদের শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তাদের অবস্থা গুরুতর হতে পারে বলে মনে করছেন ওই হলের ছাত্রীরা।

অনশনকারী প্রমি খীষা বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে হলের সব সাধারণ শিক্ষার্থী রয়েছে। হলে প্রভোস্টের সহায়তায় জালিয়াতির মাধ্যমে ছাত্রলীগের জয়ীদের অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অনশন অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে দুপুরে রোকেয়া হলের ফটকে গিয়ে সেখানে অনশনরত পাঁচ শিক্ষার্থীর দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সাংবাদিকদের নুর বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার-পাঁচজন শিক্ষার্থীও যদি অনশন করে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। গান্ধী একজন ছিলেন, বঙ্গবন্ধু একজন ছিলেন।’ রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদার পদত্যাগ দাবি করে ভিপি নুর বলেন, ‘তিনি আমাকে এবং ছাত্রীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে করে তিনি আর ওই পদে থাকতে পারেন না। তার অবশ্যই পদত্যাগ করা উচিত।’ এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাজু ভাস্কর্যে এবং রোকেয়া হলের সামনে অনশন চলছিল।