চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ২২ দিন পার হয়েছে। এখনো শোকে আচ্ছন্ন পুড়ে অঙ্গার হওয়া ৭১ জনের পরিবার। চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ সংলগ্ন আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্স লেনের মিলনস্থলের চত্বর থেকে এখনো যায়নি পোড়া গন্ধ। উৎসুক মানুষের ভিড় লেগেই রয়েছে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ পোড়া বিল্ডিংগুলো ঘিরে। এরই মাঝে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে চুড়িহাট্টা। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দুয়েকটি দোকান এরই মধ্যে
চালু হয়েছে। তবে আতঙ্ক কাটেনি এখনো। স্থানীয়দের উদ্বেগ, যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো ভবন হয়ে উঠতে পারে আরেকটি ওয়াহেদ ম্যানশন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে পোড়া আবর্জনা। দুয়েকটি বিল্ডিংয়ে চলছে সংস্কারের কাজ। অল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দুটি দোকান সংস্কার করে এরই মধ্যে চালু করেছেন ব্যবসায়ীরা। আরও দুয়েকটির সংস্কারকাজ চলছে। তবে ওয়াহেদ ম্যানশনে দুয়েকটি দোকান পরিষ্কার করা হলেও সংস্কার বা চালু করা হয়নি। পোড়া ভবনগুলো ঘিরে পথচারীদের উৎসাহ এখনো লক্ষ করা গেছে। অনেকেই মোবাইলে ভবনটির ছবি তুলছেন।
ওয়াহেদ ম্যানশনের মুখোমুখি উত্তর পাশের দুটি ভবন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডানপাশের ভবনটি চুড়িহাট্টা মসজিদের মালিকানায়। সেটির নিচতলায় বালু-সিমেন্ট দিয়ে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। বামপাশের ভবনটির কোনো দোকান সংস্কার করা হয়নি। ভবনটির মালিক মৃত ইকবাল মনসুর বাচ্চু। ভবনের নিচতলার একটি দোকানে প্লাস্টিক দানা ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করতেন মাসুম রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে, তাই দোকান সংস্কার করতে পারছি না। আপাতত বাসা থেকেই সীমিত আকারে ব্যবসা চালাচ্ছি।’ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কেউই এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই সরকার হতাহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। ক্ষতিপূরণের দাবিতে গত শুক্রবার বেশ কয়েকটি সংগঠন মানববন্ধনও করেছে। ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
চুড়িহাট্টা মসজিদের উত্তরপাশের ভবনটির শুধু একটি মুদি দোকান আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দোকানের মালিক আবদুল মান্নান। দোকান সংস্কার ও রং পালিশ করে গত বুধবার থেকে চালু করেছেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিজ টাকাতেই দোকান ঠিক করেছি। এখনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
আসগর লেনের মুখে মোহাম্মদ হোসেনের ছোট্ট দোকান। মুদি মালামালের সঙ্গে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। আগুনের উৎস থেকে একটু দূরে হওয়ায় তার দোকান তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত শুক্রবার থেকেই তিনি দোকান চালু করেছেন। জানালেন কোনো ক্ষতিপূরণই পাননি। দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাম-তালিকা তো কতজনই নেয়, পরে আর খবর থাকে না। সহমর্মিতা সবাই দেখায়। সাহায্য করার বেলায় কেউ নাই।’
ঘটনাস্থলের আশপাশে প্লাস্টিকের দানা ও অন্যান্য প্লাস্টিকসামগ্রীও বিক্রি করতে দেখা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতার জন্য কেমিক্যালের পাশাপাশি প্লাস্টিক দানাকে দায়ী করা হয়েছিল। কেমিক্যাল অপসারণে গঠিত টাস্কফোর্স প্লাস্টিক দানার গোডাউনের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়ে। পরে বিস্ফোরক অধিদপ্তর প্লাস্টিক দানা ও অর্গানিক পিগমেন্টকে অবিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ ঘোষণা করে। চুড়িহাট্টা মসজিদ ঘেঁষেই কয়েকটি দোকানে প্লাস্টিক দানা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, মেয়রের অনুমোদন নিয়েই তারা প্লাস্টিক দানা বিক্রয় করছেন। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা হিসেবে মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু ব্যবসায়ী দোকানে ‘ফায়ার ডিস্টিংগুইশার’ রাখলেও পানি ও বালি রাখতে দেখা যায়নি।
এদিকে চুড়িহাট্টার বাইরের পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও স্থানীয়দের সময় কাটছে আতঙ্ক আর ভীতির মধ্যে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভয়ের মধ্যেই প্রতিমুহূর্ত কাটাতে হচ্ছে। শুনেছি প্লাস্টিক দানা রাখার অনুমতি দিয়েছে। আরও কত কেমিক্যাল বিক্রি হয় এখানে। ওরা তো স্বীকার করে না। এমন ঘনবসতি এলাকায় এগুলো বিক্রয় ও মজুদ করা খুবই বিপদের। টাকা দিলে সবকিছু বিক্রি বৈধ হয়ে যায়।’
পিন্টু নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘টাকার লোভে ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক পুরো বিল্ডিংয়ে পারফিউমের গোডাউন ভাড়া দিয়েছেন। শুধু দোতলাতেই মাসে ১ লাখ টাকা ভাড়া নিতেন। অগ্রিম নিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। এই পারফিউমগুলোর কারণেই সারারাত আগুন জ্বলছে।’