নিউ জিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর ইসলামবিদ্বেষী খ্রিস্টান সন্ত্রাসীর বন্দুক হামলায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নিহতদের সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে ইতিমধ্যে নিহতদের তালিকা পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ক্রাইস্টচার্চে আল নূর ও লিনউড মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় হামলা চালায় শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেনটন ট্যারেন্ট। মসজিদে ঢুকে গুলি করার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার সরাসরি সম্প্রচার করে এই শ্বেতাঙ্গ যুবক। ভিডিও গেমস খেলার মতো মুসল্লিদের গুলি করে সে। শুধুমাত্র আল নূরেই ৪০ জনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ বলেন, “নিহতদেরকে এখনও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ময়নাতদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
বিবিসি জানায়, পরিবারের কাছে নিহতদের তালিকা দেওয়া হলেও তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। তবে নিহতরা সবাই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নিউ জিল্যান্ডে এসেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন আবার শরণার্থী, যারা দেশটিকে বসবাসের জন্য নিরাপদ মনে করেছিলেন।
নিউ জিল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ছাড়াও দেশটিতে অভিবাসন ও আশ্রয় গ্রহণ করা নাগরিকরা আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যান। এ ছাড়া হ্যাগলি ওভালে টেস্ট খেলতে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট দল সহ সে দেশে ভ্রমণ করা আরও কিছু লোকও ছিলেন এতে।
নুর মসজিদে সেদিন নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন ৩০০ মানুষ। লিনউড মসজিদে ছিলেন ১০০ জন মুসল্লি। আফগানিস্তান, ভারত, সিরিয়া, জর্দান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইনস, তুরস্ক, মালয়েশিয়া থেকে আসা এসব মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে এতদিন সেখানে বসবাস করে আসছিলেন।
তবে এখন পর্যন্ত নিখোঁজদের তালিকা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তারা সবাই এ নৃশংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে নিহতদের কয়েকজন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
মুসাদ ইবরাহিম (৩)
ডিনস অ্যাভেনিউর নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে নিখোঁজ শিশু ইবরাহিম। বাবা এবং ভাইয়ের সঙ্গে সেও জুমার নামাজ পড়তে ওই মসজিদে গিয়েছিল। হামলার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-ভাই পালিয়ে বাঁচলেও নিখোঁজ রয়েছে তিন বছর বয়সী এ শিশু। হাসপাতালে ভর্তি আহতদের মধ্যে খুঁজে দেখলেও তাকে পায়নি পরিবার। তারা ধারনা করছেন, হামলায় নিহত হয়েছে ইবরাহিম।
এদিকে পুলিশও জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। তবে তার নাম ও পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানায়নি তারা।
দাউদ নাদি
নিহতদের মধ্যে প্রথমেই শনাক্ত করা হয় দাউদ নাদিকে। আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া দাউদ সোভিয়েত অভিযানের মুখে ১৯৮০ সালে নিউ জিল্যান্ডে পালিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন প্রকৌশলী। অবসর গ্রহণের পর নিউ জিল্যান্ডে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করতেন তিনি। তিনি স্থানীয় আফগান অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
সন্ত্রাসী ট্যারেন্ট মসজিদে হামলা চালালে বাকিদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন দাউদ। সবার সামনে এসে ট্যারেন্টের গুলি পেতে নেন বুকে। তার ছেলে ওমর বলেন, “ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া থেকে কেউ আসলে সবার আগে তিনি এগিয়ে যেতেন।”
সাইয়্যাদ মিলনে
মায়ের সঙ্গেই আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিল এ কিশোর। তার বাবা শনিবার জানায়, আনুষ্ঠানিকাভাবে এখনো আমাদের তার ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি। তবে আমি জানি, সে আর নেই।
সাইয়্যাদ বড় হয়ে ফুটবলার হতে চেয়েছিল। তার বাবা আরও বলেন, “আমার বাচ্চাটার জন্ম মুহূর্তটা আমার মনে পড়ছে। আমি জানি সে এখন কোথায়। আমি জানি সে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।”
তার সৎবোন ব্রেডাই হেনরি বলেন, “রক্তাক্ত মসজিদে তাকে সর্বশেষ পড়ে থাকা অবস্থায় দেখা গেছে। তার ছোট শরীরের রক্তে ভিজে গিয়েছিল মসজিদও। সে ছিল সাধারণ এক কিউই শিশু।”
নাইম রশিদ
মুসল্লিদের বাঁচাতে বন্দুকধারীকে খালি হাতেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক নাইম রশিদ। পাকিস্তানের আবোটাবাদ থেকে ক্রাইস্টচার্চে আসা রশিদ ছিলেন শিক্ষক। কয়েক বছর আগে ছেলে তালহাকে নিয়ে তিনি নিউ জিল্যান্ডে আসেন তিনি।
ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দুকধারী ট্যারেন্টকে প্রতিহত করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন রশিদ। এতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি মারা যান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছে এবং তাকে একজন বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
রশিদের ভাই খুরশিদ আলম ভিডিওতে তার ভাইকে দেখে জানান, তার ভাইয়ের সাহসী কর্মকাণ্ডে তিনি গর্বিত। তিনি বিবিসিকে বলেন, “সে ছিল সাহসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে আমি শুনেছি, বন্দুকধারীকে আটকাতে এগিয়ে গিয়ে সে কিছু মানুষকে বাঁচিয়েছে।”
খুরশিদ আরও বলেন, “সে বীরত্বের কাজ করলেও তাকে হারানোর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছি না। তার ত্যাগ আমাদের জন্য এখন মর্যাদার কিন্তু তাকে হারানোটা অপূরণীয়। মনে হচ্ছে, আমার একটি অঙ্গ হারিয়ে ফেলেছি।”
তালহা রশিদ
নাইম রশিদের বড় ছেলে তালহা। বাবার সঙ্গে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন এ তরুণ। ১১ বছর বয়স থাকা অবস্থায় তালহাকে নিয়ে তার বাবা নিউ জিল্যান্ডে এসেছিলেন। পাকিস্তানি পররাষ্ট্র দপ্তর তার মৃত্যুর ব্যাপারেও নিশ্চিত করেছে গণমাধ্যমকে। তালহার বন্ধুরা জানায়, সম্প্রতি একটি নতুন চাকরি শুরু করেছিল সে। শিগগির বিয়ে করার পরিকল্পনাও ছিল তালহার।
লাহোর থেকে তার চাচা জানান, “কয়েকদিন আগে তার বাবা নাইমের সঙ্গে কথা হয়েছিল। ছেলেকে বিয়ে করাতে সে শিগগিরই পাকিস্তান আসবে বলেছিল। আর এখন বাবা-ছেলের লাশ পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনতে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে আমাদের।”
রশিদের আরেক ছেলেও মসজিদে গুলিবিদ্ধ হয়। সে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ফারহাজ আহসান (৩০)
ভারতীয় নাগরিক আহসান ১০ বছর আগে হায়দ্রাবাদ থেকে নিউ জিল্যান্ডে এসেছিলেন। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তিন বছর বয়সী একটি মেয়ে এবং ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে শিশু রয়েছে তার।
আহসানের ভাই কাশিফ বিবিসিকে জানান, আহসানের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবারের কাছে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তার বাবা সায়েদুদ্দিন বিবিসি তেলেগুকে বলেন, “শান্তিতে বসবাসের জন্য যে দেশ, সেই নিউ জিল্যান্ডেই এমন একটি ঘটনা ঘটবে ভাবতেই পারছি না।”
হোসনে আরা পারভীন (৪২)
পারভীনের স্বামী ফরিদ উদ্দিন বেশ কিছুদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। শুক্রবার জুমআর নামাজ আদায় করতে স্বামীকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে নিয়ে যান তিনি।
স্বামীকে মসজিদের ভেতরে রেখে পাশে নারীদের জন্য নির্মিত আলাদা মসজিদে চলে যান পারভীন। নামাজ শুরুর কিছুক্ষণ পর মুহুর্মুহু গুলির শব্দ শুনে পারভীন দৌড়ে যান তার অসুস্থ স্বামীকে বাঁচাতে। আর সেখানেই তিনি সন্ত্রাসীর ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন পারভীনের স্বামী ফরিদ উদ্দিন।
পারভীনের মৃত্যুর বিষয়টি স্বজনদের নিশ্চিত করেছে পুলিশ। নিউজিল্যান্ড প্রবাসী ফরিদ উদ্দিন ও হোসনে আরা পারভীন দম্পতির বাড়ি সিলেটে। এ দম্পতির একমাত্র মেয়েও নিউজিল্যান্ডে থাকেন।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ হাইকমিশনার শফিকুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ক্রাইস্টচার্চে বন্দুকধারীর গুলিতে তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. আবদুস সামাদ এবং মিসেস হোসনে আরা ও সানজিদা আকতার।
তিনি জানান, আরও দুইজন গুরুতর আহত এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও বাংলাদেশি।
খালেদ মুস্তাফা
সিরিয়া যুদ্ধে শরণার্থী হয়ে পড়া মুস্তাফা ২০১৮ সালে পরিবার নিয়ে নিউ জিল্যান্ড পাড়ি দিয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ হিসেবে এ দেশকে বেছে নিলেও শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীর গুলিতে তার প্রাণ গেল। তার এক ছেলেও এখনও নিখোঁজ, আরেক ছেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আমজাদ হামিদ (৫৭)
স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ২৩ বছর আগে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নিউ জিল্যান্ডে এসেছিলেন হামিদ। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক। তার পরিবার জানায়, “আমরা হাসপাতালে খুঁজেছি, তাকে এখনো পাওয়া যায়নি। ধারনা করছি, তিনি নিহত হয়েছেন।”
হামিদের স্ত্রী হান বলেন, “এটি খুবই ভয়ানক ব্যাপার। আমরা আমাদের এবং ছেলেদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য নিউ জিল্যান্ডকে বেছে নিয়েছিলাম। আমরা মনে করেছিলাম, এ দেশ নিরাপদ। এখন আজীবনের জন্য এ ধারণা পাল্টে গেল।”
আফগান নাগরিক
আফগান অ্যাসোসিয়েশান জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে দেশটিতে আসা আরেক ব্যক্তিও এ ঘটনায় নিহত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার নাম ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হুসাইন আল-উমারি (৩৫)
প্রতি শুক্রবারের মতোই জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন উমারি। নামাজ পড়েই দুপুরের খাবার খেতে বাবা-মায়ের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল তার। আগের দিনও তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তার। তাদের নতুন গাড়ি কেনার সংবাদে বেশ উত্তেজিত ছিল উমারি।
১৯৯০ সালে আরব আমিরাত থেকে নিউ জিল্যান্ডে আসেন উমারির বাবা-মা হাজিম আল-উমারি এবং জান্না ইজাত। হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ছেলের খোঁজ পাননি এ দম্পতি।
লিলিক আবদুল হামিদ
হামিদ ইন্দোনেশীয় নাগরিক। দুই মসজিদে সাতজনের মতো ইন্দোনেশীয় নাগরিক ছিলেন। এখন পর্যন্ত হামিদের নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আরও চার পাকিস্তানি
পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্দুকধারীর গুলিতে আরও চার পাকিস্তানি নিহত হয়েছেন। তাদের নাম হচ্ছে, সোহাইল শাহিদ, সাইয়েদ জাহানদাদ আলি, সাইয়েদ আরিব আহমেদ এবং মাহবুব হারুন। তবে তাদের বয়স ও পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। পাক মুখপাত্র মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, “আরও তিন পাকিস্তানি নাগরিকের এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
মিশরের চার নাগরিক
মিশরের জনসম্পদ এবং অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, এ ঘটনায় তাদের চার নাগরিক নিহত হয়েছে। এক ফেসবুক পোস্ট থেকে তাদের নাম পাওয়া যায়-মুনির সুলেইমান, আহমেদ গামালুদ্দিন আবদেল গানি, আশরাফ আল-মুরসি এবং আশরাফ আল-মাসরি।
জর্দানের চার নাগরিক
জর্দানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির চার নাগরিকের মৃত্যুর ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নিহতদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানা যায়নি। জর্দানের আরও পাঁচ নাগরিক আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।