৮০% শেয়ারের দরপতন

সুদহার বৃদ্ধি ও তারল্য সংকটের মধ্যে পড়েছে পুঁজিবাজার। এতে ক্রেতা কমে যাওয়ায় গতকাল লেনদেন হওয়া তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ৮০ শতাংশের দর কমেছে। কেনাবেচা নেমে এসেছে ৪৭৬ কোটি টাকায়। চলতি বছর বেশিরভাগ শেয়ারের দর কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। পুঁজিবাজারে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা, যা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলছে। গতকাল বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি কমেছে ৫০ পয়েন্ট।

২০১৮ সালে মন্দার কারণে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছরের প্রথম ১৮ কার্যদিবসে এ সূচকটির প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়। তবে এরপর থেকেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। মুনাফা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি সুদহার বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতে তারল্য সংকটের কারণে অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে যায়। চলতি বছর ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৫২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ২০৭টি দর হারায়। ফলে ডিএসইএক্স ৫৯৫০ পয়েন্ট থেকে ৫৬০৪ পয়েন্টে নেমে আসে। লেনদেনের পরিমাণ নেমে হাজার কোটি টাকা থেকে ৪০০ কোটি টাকায় নেমে আসে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে যে অস্থিরতা চলছে, এর নেপথ্য কারণ হচ্ছে তারল্য সংকট। ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে অনেকেই পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে সঞ্চয়পত্র কিংবা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ করছেন। এছাড়াও বেশ কিছু ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে। অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়লেও ব্যাংকগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এর বাইরে প্লেসমেন্ট শেয়ার ও নতুন আইপিওর কারণেও পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।  

পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাকিল রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন বছরের শুরুতে যে উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক ছিল না। সে সময় মাত্র ১৮ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক বাড়ে সাড়ে ১০ পয়েন্ট। এতে অনেকেই মূলধনি মুনাফা তুলে নিয়েছেন। এর একটি প্রভাব রয়েছে। এর বাইরে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু একটি বড় কারণ। এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অর্থ বাজার থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া কোম্পানিগুলোর বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার কারণে শেয়ার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর শেয়ারপ্রতি আয় কমছে। যে পরিমাণে শেয়ার বাড়ছে, আনুপাতিক হারে বিনিয়োগকারী বাড়ছে না। এসবই বাজারে সংকট তৈরি করছে।

তিনি  বলেন, নতুন বছরের শুরুতে কিছু বিনিয়োগকারী যোগ হয়েছিল। এ সময়ে আইসিবিও প্রায় হাজার কোটি টাকার তহবিল পায়। চীনাদের কাছে শেয়ার বিক্রির অর্থও বাজারে আসে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ শেয়ারের দরহ্রাসে ডিএসইর সূচকে নিম্নমুখী ধারা দেখা যায়, যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পতনের গতি বাড়তে থাকে। দিনশষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৪৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ২৭৯টি, বেড়েছে ৪২টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৪টির। বাজার মূলধনে শীর্ষে থাকা কিছু কোম্পানির দরবৃদ্ধিতে ডিএসইতে খাদ্য ও অনুষঙ্গ, ফার্মাসিউটিক্যালস ও টেলিযোগাযোগ খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর অধিকাংশ শেয়ারের দর কমেছে। তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন বেশি থাকায় এসব শেয়ারের দরবৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট খাতের সম্মিলিত মূলধন বাড়াতে সহায়তা করেছে। অবশ্য ৮০ শতাংশ শেয়ারের দরহ্রাসে অবশিষ্ট খাতগুলোর বাজার মূলধন কমেছে।

গতকাল ডিএসইর লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৪৭৬ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ কম। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৯৭২ কোটি টাকা। লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বেশি দরে শেয়ার কিনে আটকে যাওয়ায় লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শুরুতে ডিএসইর প্রধান সূচক সাড়ে ১০ পয়েন্ট বাড়লেও পরবর্তীকালে বেশিরভাগ শেয়ারের দরহ্রাসে মূল্যসূচকটি প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।

গতকাল ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি কমেছে সাধারণ বীমা, সিরামিক ও পাট খাতের শেয়ার দর। এসব খাত গতকাল সাড়ে তিন শতাংশ দর হারিয়েছে। এর বাইরে বিবিধ, জীবন বীমা ও তথ্য প্রযুক্তি খাত ১ দশমিক ৮ থেকে ৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। এছাড়া জ¦ালানি, বস্ত্র, প্রকৌশল, সেবা, সিমেন্ট ট্যানারি, ব্যাংক, এনবিএফআই ও সিমেন্ট খাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাজার মূলধন হারিয়েছে।