বাঘাইছড়ি সন্ত্রাসী হামলার ২৪ ঘণ্টা পরও মামলা হয়নি, গ্রেপ্তারও নেই

‘আমি মাচালং কেন্দ্রে ভোটের দায়িত্বে ছিলাম। এক পক্ষ ভোট বর্জন করেছিল, এতে আমাদের কেন্দ্রে তেমন একটা ভোট পড়েনি। ২৭০০ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছিল মাত্র ৬৮টা। সারা দিন ভোটারবিহীন নির্বাচন শেষে বিকেল চারটার দিকে ভোটের বাক্স খোলা হয়। এরপর পাঁচটার দিকে আমরা বের হয়ে যাই। পরে সাজেকের কংলাক আসা থেকে অন্য টিমের সাথে আমরা যোগ দেয়। নয়মাইল এলাকায় আসার সাথে সাথে প্রচণ্ডরকম গুলির আওয়াজ শুনে আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। গুলির আওয়াজে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। পরে যখন হুঁশ আসে দেখি আমি হাসপাতালে। চারদিকে মানুষের আহাজারি, রক্ত।’ মাচালং কেন্দ্রে নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার বাহিনীর সদস্য হাবিবুর রহমান মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের সামনেই এসব কথা বলছিলেন।

মৃত্যুর কাছ থেকে ফেরত আসা পোলিং অফিসার ইয়াসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘ফলাফল ঘোষণার পর একটি চাঁদের গাড়িতে গাদাগাদি করে আমরা প্রায় ২৫ জন বাঘাইছড়ির উদ্দেশে রওনা দিই। গাড়িতে প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, পুলিশ-ভিডিপিসহ সবাই ছিলাম আমরা। আমাদের গাড়ি বাঘাইহাট পৌঁছানোর পর সেখানে আমাদের অপেক্ষায় থাকা অন্য দুটি কেন্দ্রের নির্বাচনী কর্মীরা আরও দুটি চাঁদের গাড়ি নিয়ে বহরে যোগ দেয়। চারটি গাড়িবহরের সামনেই ছিল বিজিবির একটি গাড়ি। ঠিক পেছনেই আমাদের গাড়িটি। গাড়িগুলো নয়মাইল এলাকায় পৌঁছানো মাত্রই পাশের উঁচু পাহাড় থেকে গাড়িবহর লক্ষ্য করে গুলি আসতে থাকে। গুলি উপেক্ষা করে আমাদের সব গাড়ির চালক ছুটতে থাকেন। তাঁরা না থেমে দ্রুত চলে আসেন সরাসরি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ এক ভয়াবহ বীভৎস অভিজ্ঞতা।’ এতটুকু বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মুসলিম ব্লক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইয়াসমিন আক্তার। তিনি কথা শেষ করতে পারেন না।

সোমবার রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার গাড়িবহরে ছিলেন পোলিং অফিসার ইয়াসমিন আক্তার। নিজে বেঁচে গেলেও কাছের মানুষদের হারানোর বিষয়টি তিনি সহ্য করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘এ এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা! আমার সহকর্মী আমির হোসেন ও তৈয়ব আলী মারা গেছেন। বান্ধবী কাঞ্চি, বড় ভাই বদিউজ্জামান গুরুতর আহত। আহত-নিহত সবাই কমবেশি পরিচিত।

এভাবে নৃশংসতার শিকার নির্বাচনী কর্মীরা তাদের ভয়াবহ স্মৃতির কথা তুলে ধরছিলেন। এদিনের ঘটনায় এ পর্যন্ত মারা গেছে ৮ জন। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাতজনের মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ফুল কুমারী চাকমা মারা যান। এছাড়া চট্টগ্রাম সামরিক সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও সাতজন। বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন ও খাগড়াছড়ি হাসপাতালে দুইজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুয়ান খীসা।

এদিকে রাঙামাটি বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কাজ শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনের লাশ খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। রাঙামাটি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছুফিউল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তাদের পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আমরা বেশ চাপের মধ্যে রয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। তিনি জানান, এখনো থানায় মামলা হয়নি। মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে।

সোমবারের ঘটনার পর এখনো উপজেলায় আতঙ্ক কাটেনি। সাধারণ জনগণ খুব বেশি প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া বাসার বাইরে যাচ্ছেন না। ঘটনার পর সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে কম্বিং অপারেশন চালানো হচ্ছে। তবে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার সকালে খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার হামিদুল হক, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি(অপরাধ) মো. আবু ফয়েজ ও পুলিশ সুপার আলমগীর কবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় তারা আহতদের খোঁজ-খবর নেন।

এসময় খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার হামিদুল হক জানান, ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলের আশপাশে কম্বিং অপারেশন শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসীরা হয়তো ঘটনার পর পালিয়ে যেতে পারে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কাউকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে। নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসীদের অবস্থানে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনায় আতঙ্কের কিছু নেই। সন্ত্রাসীদের এমন কোনও শক্তি নেই যে তারা ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের হামলা চালিয়ে যাবে। তারা এভাবে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারবে। তবে সেটা খুব বেশি দিন করার মতো শক্তি তাদের নেই। সাধারণ মানুষদের ভীত না হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীর অধীনে আছে। উদ্বেগের কিছু নেই।

জেলা প্রশাসক বলেন, পাহাড়ি এই এলাকায় সন্ত্রাসীরা যেকোনো জায়গা থেকে অ্যামবুশ করতেই পারে। তবে আমাদের নিরাপত্তায় কোনও ঘাটতি ছিল না। চোরাগোপ্তা হামলা করে তারা পালিয়ে গেছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা কোনও শৈথিল্য দেখাব না।

পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা এলাকায় টহল দিচ্ছে। অভিযানের বিষয়টি গোপনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনই এই বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।

এদিকে দুপুরে বাঘাইছড়ি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) মো. আবু ফয়েজ, পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবির, জেলা আনসার কমান্ডার আবদুল আওয়াল, বাঘাইছড়ি ১১ আনসার ব্যাটালিয়নের সিও রুবায়েদ বিন সালাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদিম সারওয়ার, মেয়র জাফর আলী খানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

এসময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার টাকা এবং নিহত পরিবারকে ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন।

ইউপিডিএফের নিন্দা:

এদিকে বাঘাইছড়ির ঘটনায় যাদের দিকে অভিযোগের তির সেই ইউপিডিএফ ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। ইউপিডিএফ-এর কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব চাকমা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ‘ঘটনাস্থল ইউপিডিএফ এর সমর্থক অধ্যুষিত হওয়ায় কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম ও এক শ্রেণির গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক দলটিকে সন্দেহের তালিকায় যুক্ত করছে। এ জন্য ইউপিডিএফ ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে’।

বিবৃতিতে প্রশ্ন রেখে বলা হয়, ‘উক্ত উপজেলায় ইউপিডিএফ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে নিষ্ক্রিয় ছিল এবং ইউপিডিএফ’র কোন প্রার্থীও ছিল না, তাহলে ইউপিডিএফ কেন নির্বাচনী টিমের ওপর হামলা করে নিজেদের অহেতুক বিতর্কে জড়াবে’?

বিবৃতিতে হামলার মোটিভ ও যৌক্তিকতা বিচার না করে কেবলমাত্র হীন উদ্দেশ্যে ইউপিডিএফ-এর ওপর দায় না চাপাতে এবং প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও সাধারণ জনগণকে হয়রানি না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।