যদি কাউকে প্রশ্ন করা যায়, চাঁদ কেন সুন্দর? কেউ হয়তো বলবেন এর জ্যোৎস্নার জন্য, কেউ বলবেন এর গোলাকার আকৃতির জন্য। কিন্তু চাঁদের সেই আকৃতি বা জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যও তো বদলে যায় কত কতভাবে। কেউ চাঁদের উজ্জ্বল গোলাকার আকৃতিকে ঝলসানো রুটির মতো দেখেন, কেউ বাঁকানো চাঁদকে দেখেন কাস্তের মতো। কারও কাছে চাঁদকে মনে হয় নিছক বোকা অথবা ছোকড়া! এ সবকিছুই তো ঘটে চলে যার যার নিজস্ব দিনযাপনের অভিজ্ঞতার মাত্রার তারতম্যের জন্য। আর দেখা ও দেখানোর কৌশল রপ্ত করার মধ্য দিয়ে। চিত্রকলায় সবচেয়ে কঠিন নাকি কালো রঙের প্রকাশ ঘটানো। কোনো কোনো শিল্পী কালো চাঁদ এঁকেছেন, তাতে নাকি চাঁদের সৌন্দর্য প্রকাশে কোনো ঘাটতি হয়নি। নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা চাঁদকে নতুন রঙে দেখায় যদি ঘাটতিই না মেলে তবে বুঝতে হবে এর পেছনে রয়েছে শিল্পীর বিশেষ কেরামতি। গদ্য সাহিত্যে এমনতর কেরামতির দরকার পড়ে রঙ্গ-ব্যঙ্গ প্রকাশের ক্ষেত্রে। পদ্যে বা ছড়ায় যেমন অনায়াসে করেছিলেন সুকুমার রায়, তারও আগে কিছু ছড়ায় রবীন্দ্রনাথও। অবশ্য গদ্যেও সুকুমার রায় সে ছাপ রেখেছেন। কিন্তু সে সব রচনা অজ্ঞাত কারণে শিশুতোষ হিসেবেই চিহ্নিত রয়ে রইল। যদিও সে সব রচনায় বড়দের চিন্তার খোরাকই বেশি। কিন্তু সত্যিকারের বড়দের রচনায় বিশেষত বাংলা সাহিত্যে রঙ্গ-ব্যঙ্গ এবং চিন্তার যূথবদ্ধতার খোঁজ নিতে গেলে সংখ্যার হিসাবে দুই আঙুলের মধ্যে আটকে যেতে হয়। রাজশেখর বসু আর শিবরাম চক্রবর্তী, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় আর তারাপদ রায়... এর চেয়ে বেশি নাম তো সহজে আর মনে পড়ে না! এদের মধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী এবং তারাপদ রায়ের বেশ মিল রয়েছে। দুজনই গল্প জমিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখেন। দুজনই মজলিসি ভঙ্গিতে গল্প বলতে বলতে আড্ডার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। গল্প ছুটে চলে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে, সে গল্পের গতির হিসাব রাখা দায়! হাসির তোড়ে উড়ে যায় এক জীবনের যত দায়-দেনা, যত বন্ধন। কেবল আড্ডা বা মজলিসি মেজাজের জন্য নয়, সৈয়দ মুজতবা আলী আর তারাপদ রায়ের আরও এক মিল রয়েছে। দুজনেরই জীবনাভিজ্ঞতা তীক্ষ, তীব্র আর সেই জীবনকে প্রকাশে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত স্বাদু সরসতা। এত এত মিলের পরেও দুজনেরই রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা, গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গি, দেখা ও দেখানোর ভিন্নতর কৌশল।
বইটা নতুন নয়, পুরাতন। প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬। আনন্দ পাবলিশার্সের পেপারব্যাক। নামটা উদ্ভট...ক খ গ ঘ । লেখক তারাপদ রায়। সদ্য প্রয়াত হয়েছেন তিনি। প্রশ্ন ওঠে মনে, ক আছে, খ আছে, গ আছে এমনকি ঘ-ও আছে কিন্তু ঙ নেই কেন বইটার নামে? না, এর কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে না এ বইয়ে অন্তত। কিন্তু ছোট কলেবরের বইটা পড়তে পড়তে বোঝা যাবে যে পাঁচটা বর্ণ দিয়ে পুরো একটা বর্গের সমাপ্তি হয়তো ইচ্ছে করেই রাখেননি লেখক। জীবন তো পূর্ণ নয়, জীবনের কথামালা আরও বেশি অপূর্ণ। সুতরাং ব্যঞ্জনমালার প্রথম বর্গটিও অপূর্ণ থাকুক।
তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০১৮) জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষে, বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে। ১৯৫১ পর্যন্ত বাংলাদেশেই বেড়ে ওঠা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক লেখাপড়া তারপর কলকাতায় কলেজে পড়তে যান তিনি। অর্থনীতি নিয়ে উচ্চতর লেখাপড়া করেছেন। পেশাগত জীবন শুরু করেছেন শিক্ষকতা দিয়ে। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধিকর্তা হন। বালক বয়েস থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। প্রকাশিত কবিতার সংখ্যা সহস্র ছাড়িয়ে গেছে। পূর্বমেঘ ও কয়েকজন নামে দুটো লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। ছোটগল্প, ছোট উপন্যাস, শিশুসাহিত্য আর অজস্র রম্য রচনায় এক বর্ণিল সাহিত্য জীবন তার।
ক খ গ ঘ মূলত রম্য রচনারই বই। খোশগল্পের আসর বসিয়েছেন তিনি এখানে। চল্লিশটা গল্পের রসিক কথক। আসলে এগুলো ঠিক গল্প নয়, যেমন গল্পের সংজ্ঞার্থ মুখস্ত করে সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা। এ গল্পগুলোকে সেসব সংজ্ঞায় বাঁধা যাবে না। কিন্তু প্রতিটা গল্প এই জীবনেরই, পরিপার্শ্বের, এই পরিচিত পুরাতন পৃথিবীর। মজার ব্যাপার হলো, সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়েও একটা গল্প আছে। সেটাই এই বইয়ের শেষ গল্প। সেই গল্প দিয়েই এই বইয়ের আলোচনা শুরু করা যাক। তারও আগে জানিয়ে রাখা ভালো যে, এ বইয়ের বেশিরভাগ গল্প লেখক ধার করেছেন অন্যের কাছ থেকে। তাহলে, আবার প্রশ্ন ওঠে, এ বইয়ে লেখকের কৃতিত্ব কোথায়? কৃতিত্ব তার গল্প সংগ্রহের আগ্রহে, সংযোজনে আর গল্পের শুরুতে বা মাঝে তীর্যক বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে। যেমনটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে লেখাটির শুরুর অংশের। এ লেখাটি তিনি যখন লিখেছেন ততদিনে সৈয়দ মুজতবা আলী প্রয়াত হয়েছেন অথচ তিনি লেখাটি শুরু করলেন এভাবে, ‘অনেকদিন পরে এবার একজন জ্যান্ত মানুষের কথায় আসছি, সৈয়দ মুজতবা আলী।’ মৃত মানুষকে দিব্যি ‘একজন জ্যান্ত মানুষ’ বলে ফেললেন কেন তারাপদ রায়? এর উত্তর দিলেন দারুণ কৌশলে, ব্যক্তিগত দেখার কিংবা উপলব্ধি করবার অভিজ্ঞতা দিয়ে। লিখলেন, ‘আমার এই অল্পবেশি চার দশকের সাহিত্যজীবনে কত উত্থান-পতন দেখলাম। কত দিগি¦জয়ী লেখককে ঘোড়া থেকে ছিটকিয়ে মুখ থুবড়িয়ে পড়তে দেখলাম। ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছিল যে লেখককে, মৃত্যুর দু’বছর পরে তার আর কোনো পাত্তা নেই। তার বইয়ের বিজ্ঞাপন নেই। শৌখিন পাঠিকার বালিশের নিচে কেশতেলে সিক্ত সেই পুরনো পত্রিকা আছে কিন্তু তাতে তার কোনো কথা নেই।
বেশি বলে লাভ নেই। মোদ্দা ব্যাপার হলো, জীবদ্দশায় অতি বিখ্যাত, অতি জনপ্রিয় অনেক লেখকই মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মরে যান। দু-চার দিন ওই শ্রাদ্ধশান্তি, নিয়মভঙ্গ পর্যন্ত টিকে থাকেন। তারপর কানামাছি ভোঁ-ভোঁ কিন্তু আশ্চর্য কৌশলে মুজতবা বেঁচে রয়েছেন।’ তারপর ছোট্ট এই লেখায় কোরক নামক সাহিত্য পত্রিকার মুজতবা আলী সংখ্যা থেকে তিন-চারটা গল্প বলেন যে গল্পে রসিক মুজতবার ব্যক্তিজীবন পুনরায় প্রাণ পায় তারাপদ রায়ের বাচনভঙ্গিতে। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের বছরে এক সাহসী দেশাত্মবোধক গান বেঁধেছিলেন রাজশাহীর এক অখ্যাত পল্লীকবি। পেশায় তিনি ছিলেন নামকরা উকিল। অথচ ঐ এক গানের মধ্য দিয়েই আজও বাঙালির কাছে শ্রদ্ধেয়জন হয়ে আছেন। গানটা হলো, ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই...’। কিন্তু ‘কান্তকবি’তে রজনীকান্ত সেনের এই গান বা স্বদেশি চেতনা নিয়ে কোনো কথা নেই। গল্পগুলো তার ওকলাতি জীবন নিয়ে। হাসতে হাসতে অন্য এক রজনীকান্তকে আবিষ্কার করা যায় সেসব গল্পে।
এ বইয়ের চল্লিশটা রচনায় এমন অজস্র গল্পের ছড়াছড়ি। গল্পগুলো কিন্তু কেবল ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। জীবনের তুচ্ছ সব অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো রস সংগ্রহ করেছেন তিনি। এক গল্প থেকে অন্য গল্পের মধ্যে সংযোজন করেছেন রঙ্গ-তামাশাপূর্ণ নিজস্ব মন্তব্য। ‘হায় ভীরু প্রেম’-এর শুরুতে লিখেছেন, ‘ভালোবাসা নাকি চাঁদের মতো। কখনো এক অবস্থায় থাকে না। হয় বাড়ে না হয় কমে। চন্দ্রকলার মতো হয় প্রেম ক্রম বিকশিত হয় নতুবা ক্রম বিনাশিত হয়।’ এ জাতীয় মন্তব্যের পর বিকশিত বা বিনাশিত প্রেমের গল্পের খোঁজে না গিয়ে উপায় থাকে না রসিক পাঠকের।