ভয়ানক হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপগুলো। তাদের হাতে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ নানাবিধ অপরাধ ঘটছে। কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধীদের তালিকা করা হলেও কম বয়স ও অতীত অপরাধের তথ্য না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে না। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তারসহ আইনি ব্যবস্থা নিয়ে এসব কিশোরকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এজন্য তাদের মা-বাবাকে সচেতন করা জরুরি। পাশাপাশি এসব কিশোরকে কাউন্সেলিং করাতে হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব কিশোর গ্রুপ পরে মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়া ঘুরে বেড়ানো, ইভটিজিং, মাদকাসক্তি, মাদক ও ছিনতাই-চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে; বিরোধে খুন-খারাবিও হচ্ছে অহরহ। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরখানে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্রুপের মধ্যে বিরোধে খুন হয় স্কুলছাত্র কামরুল হাসান হৃদয়। গত ৭ মার্চ একই ঘটনায় পুরান ঢাকার বকশীবাজারে বক্সার-ইমন গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুন হয় বক্সার ওরফে সেজান। ১২ মার্চ সিলেটে খুন হয় ছাত্রলীগ কর্মী সাব্বির, ১৬ জানুয়ারি কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনাদ ইফসার, এর আগে উত্তরায় ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘বিগ বস’ গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুন হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর, আশুলিয়ায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আল-আমিন শেখ ও একাদশ শ্রেণির ছাত্র হাসানসহ বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোর খুন হয়েছে। অভিভাবকরাও এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানী এবং এর আশপাশে কিশোর-তরুণদের অন্তত ৫০টি গ্যাং শনাক্ত করা গেছে। তারা ইভটিজিং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক সেবন, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে রাজধানীর উত্তরায় পাঁচটি, উত্তরখানে তিনটি, দক্ষিণখানে পাঁচটি, আশুলিয়া ও তুরাগ এলাকায় পাঁচটি, ধানমণ্ডিতে তিনটি, পুরান ঢাকার বংশাল-চকবাজার এলাকায় অন্তত পাঁচটি, ডেমরা এলাকায় কমপক্ষে তিনটি, তেজগাঁওয়ে দুটি এবং কাফরুল, মোহাম্মদপুর, তুরাগ, নিউ মার্কেট, কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল, যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জ, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও এলাকায় একটি করে গ্রুপ সক্রিয় আছে। প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ১৫ জন কিশোর অপরাধী রয়েছে। দক্ষিণখানে গ্যাং লিডার শাহীন ও রিপনের নেতৃত্বে একটি, উত্তরখান থানার বড়বাগের নাজিমউদ্দিন গ্রুপ, আটিপাড়ার শান্ত গ্রুপ, খ্রিস্টানপাড়ার সোলেমান গ্রুপ, আটিপাড়ার মেহেদী গ্রুপ, ট্রান্সমিটার মোড়ের রাসেল ও উজ্জ্বলের গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মিরপুর ১২ নম্বরে সক্রিয় আছে কিশোর গ্যাং ‘বিচ্চু বাহিনী’। বিচ্চু বাহিনীর আলাদা
আলাদা শাখা আছে। এর মধ্যে ১২ নম্বর এলাকায় সক্রিয় পিচ্চি বাবু ও সাইফুলের গ্রুপ। এই দুই গ্রুপে অন্তত ৩০ জন কিশোর সক্রিয় রয়েছে। মিরপুর-১১ নম্বর বি-ব্লকে সক্রিয় বিহারি রাসেলের গ্যাং, ১২ নম্বরের সি-ব্লকে সাব্বির, ডি-ব্লকে গ্যাং বাবু ও রাজন, চ-ব্লকে রিপন, ধ-ব্লকে মোবারক গ্রুপ সক্রিয় আছে। এদের অধিকাংশই পল্লবী থানার তালিকাভুক্ত কিশোর অপরাধী।
মিরপুর থানায় তালিকাভুক্ত কিশোর অপরাধীদের মধ্যে রয়েছে মুক্তার, মিন্টু, মন্টু, রেজু, শাহিন, বাহেন, পাইলট, বাচ্চু, এলিন, জাফর, লেংড়া তাজ, উঁচা বাবু, জনি, মতিন, মাইনুদ্দিন ও আলমাস। এসব কিশোর অপরাধীর মধ্যে স্কুলছাত্র ও পথশিশুও রয়েছে। কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার কিশোর সন্ত্রাসীদের অন্যতম হচ্ছে নয়ন গ্রুপ। তার গ্রুপে আছে পুলিশ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী চামাইরা বাবু, রাসেল ওরফে বোটকা রাসেলসহ ১০ থেকে ১২ সন্ত্রাসী। এদের মধ্যে প্রায় আটজন মিরপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র। তাদের বয়স ১৬ থেকে ২০-এর মধ্যে।
নিউ মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় কাজ করে কিশোর গ্যাং ‘মিশন গ্রুপ’। এই গ্রুপে ঢাকা কলেজের ছাত্র হারুনুর রশিদ খান ও মইনুল ইসলাম, আইডিয়াল কলেজের জাহিদ নামে একজনের নাম রয়েছে। এই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নেতা জামালউদ্দিনের নাম আছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় রয়েছে গ্রুপ টুয়েন্টিফাইভ। এই গ্রুপের সদস্য প্রায় ১০। এই গ্রুপে আরিফ হোসেন, তাজুল ইসলাম, রুবেল, এনামুল হক, শামছুল হকের নাম আছে। এরা সবাই নিজেদের ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে।
রাজধানীর ধানম-ি এলাকায় ‘নাইন এম এম’, ‘একে ৪৭’ ও ‘ফাইভ স্টার’ নামে তিনটি কিশোর গ্রুপ সক্রিয়। তাদের বিষয়ে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ধানম-ির-৯-এর এলাকায় নাইন এম এম গ্রুপ সক্রিয়। গ্রুপের লিডার ইসমাইল হোসেন। সে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সহসভাপতি। ধানম-ি-৭-এর এলাকায় থাকা ‘একে ৪৭’ গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় মুকুল শিকদার। সে ধানম-ি থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি বলে জানা গেছে। ধানমণ্ডিতে ফাইভ স্টার গ্রুপের কার্যক্রম রবীন্দ্র সরোবর ও আশপাশ এলাকায়। গ্রুপের প্রধান ইট্টু ওরফে ইন্তু।
রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনি ও কুনিপাড়া এলাকায় ১০-১২ জনের একটি গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন মাইনউদ্দিন। তিনি স্থানীয় যুবলীগের কর্মী। তাদের মূল আড্ডা তেজকুনিপাড়া পোস্ট অফিস মোড়ে।
রাজধানীর তুরাগ থানার পাকুরিয়া, আহালিয়া, বাউনিয়া ও দলিপাড়া এলাকায় ১৫ জনের একটি গ্রুপ সক্রিয়। এই গ্রুপে আছে রাজু, গিট্টু ইমন, ককটেল গাজী, হানিফ, চায়নিজ সোহান, পলিথিন বাবু। পুলিশের খাতায় তাদের নাম ‘তালাচাবি গ্রুপ’ বলা হয়েছে।
এছাড়া উত্তরায় ‘পাওয়ার বয়েজ’, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার ও ‘নাইন এম এম বয়েজ’সহ বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘বিগ বস’ দ্বন্দ্বে খুন হয় স্কুলছাত্র আদনান কবীর।
রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংগুলোর দিকে থানা পুলিশ ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নজরদারি রাখছে। এরই মধ্যে এসব গ্রুপের অনেক সদস্য আটক হয়েছে। উঠান বৈঠক, বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
কিশোর গ্যাং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশং ব্যবস্থা জোরদার করা। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মহল্লায় উঠান বৈঠক করা। কোনো কিশোর গ্যাং বা ছোট অপরাধে জড়িত হওয়ার তথ্য পেলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত তার মা-বাবা ও অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের বোঝানো। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কিশোরদের অপরাধের জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনা।’