শুধু ইসলামি সন্ত্রাসবাদ নয়, যে কোনো ধরনের উগ্র মতবাদ কী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তা ১৫ মার্চের নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে আবারও উন্মোচিত হলো। একজন উগ্র শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী বন্দুকধারী যেভাবে কয়েক কিলোমিটার ব্যবধানের দুটি মসজিদে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য ফেইসবুকে লাইভ করেছে, সেই নৃশংসতার তুলনা করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু এ নৃশংস হত্যাকা-ের পর নিউজিল্যান্ড ও এর প্রধানমন্ত্রী যে ভূমিকা নিয়েছেন তা বিশ্বের সামনে অনুকরণীয় এক নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভাজনের বদলে ঐক্য, ভীতির বদলে সংহতি ও সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে জেসিন্ডা একাই শুধু নন, নিউজিল্যান্ডের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যে যূথবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন তা অভূতপূর্ব। জেসিন্ডা শান্তির ধর্ম ইসলামের নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে বৈশ্বিক ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।
তার দেশের মুসলমানদের আস্থায় নিতে জেসিন্ডা সম্ভাব্য সবকিছুই করে যাচ্ছেন। তিনি এরইমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন, তার দেশের মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন, সংখ্যালঘু বা আলাদা কোনো গোষ্ঠী নয়। তারা মূলধারারই অংশ। নিউজিল্যান্ডে থাকা মুসলমান সম্প্রদায়ের রক্তক্ষরণ হলে পুরো দেশেরই রক্তক্ষরণ হয়। মুসলমানদের অভয় দিয়ে, আস্থায় নিয়ে জেসিন্ডা মূলত পুরো দেশকেই ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এর আগে তিনি সব ধরনের সামরিক ধাঁচের স্বয়ংক্রিয় এবং আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। সাম্প্রতিক অতীতে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী বিভিন্ন হত্যাকা- চালিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডে এই ধরনের বন্দুক হামলার ঘটনা বিরল। ১৯৯০ সালে সাউথ আইল্যান্ডের আরামোয়ানা শহরে মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তি গুলি করে ১৩ জনকে হত্যা করে। এরপর দেশটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কড়াকড়ি করা হয়। তবে গত ১৫ মার্চের হামলায় প্রমাণিত হয়, পশ্চিমা বিশ্বে আজ বহুত্ববাদ নানা দিক দিয়েই হুমকির শিকার। এখানে অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থিরা দিন দিন
মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা অনেক দেশে সরকার পরিবর্তনেও কলকাঠি নাড়ছে। ২০০৭ সালে বিশ্বমন্দা শুরু হওয়ার পর এইসব দেশের স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে এই ধারণা তৈরি করা হয় যে, তাদের কর্মসংস্থান অন্য দেশের নাগরিকরা এসে কেড়ে নিচ্ছে। অথচ বিশ্বায়নের ধারণা থেকে উৎপাদনের অন্যতম মিনস বা উপাদান হিসেবে শ্রমিকের দেশান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে মন্দাভাব দেখা না দিলে হয়তো এতটা খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। যুক্তরাষ্ট্রসহ তার পশ্চিমা মিত্ররা এতদিন ধরে তথাকথিত ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদসহ আরও যেসব উগ্র মতবাদ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তাদের দেশের অভ্যন্তরে উদ্ভূত হয়েছে তার মোকাবিলা কীভাবে করবে সেটাই এখন বিশ্ববাসীর দেখবার বিষয়। অতীতে অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্বযুদ্ধের সৃষ্টি করেছিল, ফ্যাসিবাদের উন্মত্ততা দেখা গেছে।
জেসিন্ডা আরডার্নের এই সময়োপযোগী সাহসী সিদ্ধান্তকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখেছে। তারা লিখেছে আপাতত বিশ্বের উচিত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ভয়কে যেভাবে সামলেছেন, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া। পত্রিকাটি লিখেছে যে, এটি (ক্রাইস্টচার্চে হামলা) ও এ ধরনের অন্য যেকোনো নৃশংসতার ক্ষেত্রে বর্ণবাদের সোজাসাপ্টা নিন্দায় বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া; ভুক্তভোগীদের ব্যথায় সমব্যথী ও ঘৃণাকারীদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া উচিত। আরডার্ন সে পথ দেখিয়েছেন। আর আমাদের মতো দেশ যেখানে ধর্মীয় বিভাজন প্রায়শই সহিংস ঘটনা জন্ম দেয় সেখানে জেসিন্ডার দৃষ্টান্ত অনুকরণীয়। জেসিন্ডা শিখিয়েছেন যে কীভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থকেও বিবেচনা করতে হয়, তাদের বিপদে কীভাবে সহমর্মিতা দেখাতে হয়, তাদের কাছে টানতে হয়। আমাদের দেশে আমরা বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতি একই ধরনের আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটালে অবশ্যই দেশে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা সম্ভব। জেসিন্ডার দৃষ্টান্তকে পাথেয় করে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াই খুবই জরুরি।