বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বাধার মুখে আইন সংশোধন

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৪টি। শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইন অমান্য করার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর তোয়াক্কা না করেই ভর্তি ও নিয়োগ-বাণিজ্য, ইচ্ছামতো টিউশন ফি নির্ধারণ, তহবিলে নয়-ছয়, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে গড়িমসি, ইচ্ছামাফিক বিভাগ খোলার অভিযোগ বেশ পুরনো। আইনের ফাঁকফোকরের কারণেই কর্র্তৃপক্ষ এমন অনিয়ম করার সুযোগ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেসব অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু সংশোধন করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্যোক্তারা সংশোধনের বিভিন্ন ধারায় আপত্তি জানিয়েছেন। এতে আইনটি  চূড়ান্ত হতে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ সংশোধন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৭ সালে। প্রথম দফায় আইনের প্রাথমিক কিছু ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব করে ইউজিসি। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি একটি ‘১ নম্বর সাব-কমিটি’ গঠন করলে তারা আইনটি নিয়ে কাজ শুরু করে। একের পর এক বৈঠকে আইনটির বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাব করে এই কমিটি। তাতে বাগড়া দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)।

এপিইউবির কর্তারা অভিযোগ করেন, উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই আইন সংশোধন করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে আইন সংশোধনের আপত্তিসহ প্রস্তাব দেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের আহ্বান করা হলে তারা তা প্রদান করেন।

আইনটি সংশোধনের বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাব-কমিটির কয়েকজন সদস্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্নভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা আইন সংশোধনে বাধা দিচ্ছেন। বিভিন্ন ধারায় সংশোধনের যে সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে তাদের ব্যাপক আপত্তি রয়েছে। কারণ আইনে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তাতে উদ্যোক্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি করার সুযোগ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

আইন সংশোধনে উদ্যোক্তাদের এমন বাধার বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনটি সংশোধনে যেসব বিষয়ে কমিটি চূড়ান্ত করতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা তা মানতে চায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতার পরিবর্তন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অনিয়ম করে যাচ্ছে, যা ২০১০ আইন দিয়ে ধরা যাচ্ছে না। একের পর এক অনিয়ম করেই যাচ্ছে। শিক্ষার মান ঠিক রাখতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।’

আইনের সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বেনজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত ২০১০ সালের আইনটি শিক্ষাবান্ধব। এই আইনের পরিবর্তন, পরিমার্জন প্রয়োজন আছে কি না, তা আমরা মনে করি না। তার পরও যেহেতু মন্ত্রণালয় কিছু স্থানে সংশোধন করতে চায়, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই আইনটির বিভিন্ন ধারায় ব্যাপক সংশোধন এনে সুপারিশ করে কমিটি। পরে আমরা এতে আপত্তি জানালে সংসদে যায়, সেখানে কিছু প্রস্তাব আমরাও দিয়েছি। তারপর জাতীয় নির্বাচন চলে এলো, সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বর্তমানে বিষয়টি আগের অবস্থাতেই রয়েছে বলে জানি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমরা এটাও বিশ্বাস করি, আর এটাই বাস্তবতা। যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করতে চায়, তাদের কোনো আইন দিয়েই ধরা সম্ভব নয়।’

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেলায়েত হোসেন তালুকদার (বিশ্ববিদ্যালয়-১ অধিশাখা) বলেন, ‘আইনটি সংশোধনের কাজ চলছে গত দুই বছর ধরে। মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটি আইন সংশোধনে যে কমিটি করে দিয়েছিল, সেই কমিটি কাজ করছে। বেশ কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে এ বিষয়ে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলেই আমার কাছে খবর আছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে কিছু অগ্রগতি ছিল। এখন মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী এসেছেন। আইনটি সংশোধন নিয়ে যথাযথভাবেই কাজ করবেন।’

সংশোধনে যেসব সুপারিশ করে ‘১ নম্বর সাব-কমিটি’ : শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২৪তম বৈঠকে আইন সংশোধনে ‘১ নম্বর সাব-কমিটি’র দাখিলকৃত প্রতিবেদনে আইনটির বেশ কিছু ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের পরই উদ্যোক্তারা কমিটিকে তাদের আপত্তির কথা জানায়। যদিও সংশোধনের কিছু ধারা মেনেও নিয়েছেন তারা। এরই মধ্যে তা কার্যকরও শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

২০১০ সালের বিদ্যমান আইনের ৬(১) ধারায় বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠন, পরিচালনা, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করতে মঞ্জুরি কমিশন হস্তক্ষেপ করার শর্ত নেই। তবে প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়, কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করা যাবে না। কমিশন বোর্ডে একজন সাময়িক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেবে।

প্রস্তাবিত আইনের ৬(৯) ধারায় বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত তহবিলের টাকা বা লভ্যাংশ কমিশনের অনুমতি ছাড়া উত্তোলন এবং অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করা যাবে না। তবে কমিশনের অনুমতি নিয়ে তার লভ্যাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে কমিশনের কোনো অনুমতি নিতে হয় না। প্রস্তাবিত আইনের ২৫(ঘ) ধারায় বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত অর্থ কমিটিতে কমিশন মনোনীত আর্থিক বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সদস্য রাখতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে তা বলা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন উৎসের বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনের ৪১(৪) এবং ৪২ ধারায় বলা হয়, শিক্ষার্থীর ফি মঞ্জুরি কমিশন নির্ধারণ করে দেবে। যদিও বিদ্যমান আইনে ইউজিসিকে ফি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া নেই।

প্রস্তাবিত আইনের ৪৫ ধারায় বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব ইউজিসি মনোনীত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করাতে হবে। বিদ্যমান আইনে ইউজিসির এই ক্ষমতা নেই। প্রস্তাবিত আইনের ৪৭(২) ধারার উপধারা (১)-এর অধীন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সনদপত্র গ্রহণ না করলে ওই সময়সীমার পর কমিশনের সুপারিশক্রমে সরকার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক অনুমতিপত্র বাতিল করে বন্ধ ঘোষণা করবে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে ইউজিসির সুপারিশের বিষয়ে উল্লেখ নেই।

প্রস্তাবিত আইনের ৪৯(২) ধারায় বলা হয়, সরকার ও কমিশনের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করবে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে ইউজিসির হাতে ক্ষমতা নেই। প্রস্তাবিত আইনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতার বিষয়ে ৫০ ধারায় বলা হয়, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরামর্শক্রমে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রয়োজনে বিধি প্রয়োগ করতে পারবে। বিদ্যমান আইনে কমিশনের কোনো পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়নি। কেবল সরকারের হাতেই ক্ষমতা রয়েছে।