নগরজীবনে অপ্রতুল অগ্নিনিরাপত্তা

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশান ও বনানীতে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে দুটো বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটল। বৃহস্পতিবার আগুন লাগল বনানীর সুউচ্চ এফআর টাওয়ারে, আর শনিবার আগুনে পুড়ল গুলশানের ডিএনসিসি (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) মার্কেট। এফআর টাওয়ারের আগুনে মারা গেছে অন্তত ২৫ জন, আহত হয়েছে কয়েক ডজন মানুষ। ডিএনসিসি মার্কেটের আগুনে কেউ হতাহত না হলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বেশ। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, সেখানে অন্তত ২০০ দোকান পুড়ে গেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালেও ডিএনসিসি মার্কেটে তখন এটা ডিসিসি মার্কেট বলে পরিচিত ছিলÑ একইরকম আগুন লেগেছিল। তখন উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখানে আধুনিক এক ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য একটা অস্থায়ী মার্কেট তৈরি করা হয়েছিল, যেটি শনিবার পুড়ে গেল। প্রতিশ্রুত সেই ১৮ তলা মার্কেট কবে মাথা তুলে দাঁড়াবে কেউ জানে না, তবে অগ্নিদুর্ঘটনার ব্যাপারে ২০১৭ সালের ঘটনা থেকে যে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করেনি, তা স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

এ দুটো দুর্ঘটনা এমন এক সময়ে সংঘটিত হলো, যখন পর্যন্ত রাজধানীবাসী গত ২১ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার ট্রমা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। সেখানকার চুড়িহাট্টায় সংঘটিত ওই ঘটনায় ৭১ জন মানুষ প্রাণ হারায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু ব্যবসায়ী। আরও বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, এ চুড়িহাট্টা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের নিমতলীতে ২০১০ সালে এর চেয়েও ভয়াবহ এক আগুনে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, এমনকি অনেক পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এরপরও ওই এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য খুব কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

এ নগরীতে এর আগে প্রায়ই বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটতে দেখা যেত, যেখানে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি স্বপ্নেও চিন্তা করা যায় না। উপরন্তু, এমনও কথা চালু আছে যে, বিশেষ করে পরবর্তী সময়ে ওই ভস্মীভূত বস্তিগুলোর অনেক কটির জায়গায় হাউজিং ও শপিং মল গড়ে ওঠায় যার কিছুটা হলেও ভিত্তি আছে বলে অনেকে মনে করেন, বস্তিগুলোতে আগুন যতটা না লেগেছে তার চেয়েও বেশি লাগানো হয়েছে। কিন্তু উপরিউক্ত ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই অন্তর্ঘাতমূলক বলে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। মোট কথা, এ ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্নে অভিজাত-অনভিজাত বলে অন্তত এ নগরীতে কোনো ভেদাভেদ নেই। ধনী-নির্ধন সবাই অগ্নিদানবের কাছে অসহায়। তার ওপর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ মার্চÑ মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে তিনটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনা, অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা, এটাই ইঙ্গিত করছে যে, খুব জরুরিভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সামনের দিনগুলোতে নগরবাসীদের , হয়তো আরও অনেক এমন ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হবে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর বিবিসি বাংলা অনলাইন ঢাকা শহরের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে একটা প্রতিবেদন ছাপিয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের, দেশে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি প্রথমত যাদের দেখার কথা, একটি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়েছিল। জরিপটি চালানো হয়েছিল ঢাকার দুই হাজার ৬১২টি ‘জনবহুল’ ভবনের ওপর, যে ভবনগুলোতে ছিল শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি। দেখা গেছে, ওই ভবনগুলোর মধ্যে মাত্র ৭৪টিতে অগ্নিনির্বাপণের মোটামুটি ব্যবস্থা চালু ছিল। অর্থাৎ জরিপকৃত দুই হাজার ৫৩৮টি ভবন অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্নে ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এ তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা বলা নিশ্চয়ই অতিরঞ্জন হবে না যে, নগরীতে, আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্মারক হিসেবে, আমরা আধুনিক-অত্যাধুনিক নানা ভবন তুলছি বটে, কিন্তু ভবনগুলোকে সবদিক থেকে নিরাপদ করতে পারিনি।

অনেকেই, বিশেষ করে বামপন্থার অনুসারীরা, কোনো দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ না রেখেই এর জন্য ভবন মালিকদের ‘মুনাফালোভিতা’কে দায়ী করেন। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের এ দাবিটি হয়তো সত্য, কিন্তু সমস্যার মূল বের করতে হলে আমাদের দৃষ্টিকে আরেকটু প্রসারিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নগরে যখন একটা ভবন বা মার্কেট গড়ে ওঠে তখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে ভবন বা মার্কেটটির মালিক বা নির্মাতা, তার ব্যবহারকারীÑ যাকে আমরা সরল ভাষায় ভাড়াটিয়া বলতে পারি এবং সর্বোপরি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

 যেমন, এফআর টাওয়ারটির কথা যদি বলা হয় তাহলে বলতে হয় সেখানে যেমন ভূমির মালিক ও নির্মাতা ছিলেন তেমনি তাদের নজরদারি করার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)ও ছিল। আবার যারা এতদিন ধরে ভবনটি ব্যবহার করে এসেছেন তারাও ছিলেন। অর্থাৎ নির্মাতা যদি নির্মাণকাজে ফাঁকি দিয়ে থাকেন সেটা রাজউকের চোখে পড়ার কথা ছিল এবং ব্যবহারকারীদেরও বিষয়টা খেয়াল করার কথা ছিল। কিন্তু, আজ ওই ভবনটিতে আগুন লাগার জন্য যে যাকেই দায়ী করুক, এটা মানতেই হবে যে স্টেকহোল্ডারদের কেউই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি।

এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক মেজর এ কে এম এম শাকিল নেওয়াজের কিছু কথা, যা ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট বিবিসি বাংলার অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিল, স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘ফায়ার ফাইটিং শুধু ফায়ার সার্ভিসের কাজ না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব একটা আয়োজন থাকতে হবে যাতে আগুন লাগলে দশ থেকে বিশ মিনিট ফাইট করা যায়। কিন্তু সেটা আমাদের নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেখা যায় নামে মাত্র টিম আছে যাদের প্রফেশনাল ট্রেনিং নেই, ইকুইপমেন্ট নেই, পারসোনাল প্রটেকশন গিয়ার নেই। অনেক বিল্ডিংয়ে ফায়ার ইকুইপমেন্ট আছে কিন্তু তা ঠিকভাবে মেইনটেইন করা হচ্ছে না। আবার লোকজন জানেও না কীভাবে এটা ব্যবহার করতে হবে।’

এই যখন বাস্তবতা তখন দ্রুত বিকাশমান এ নগরীর অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের খুব বাস্তবসম্মত (প্রাগমেটিক) কিছু কাজ করতে হবে। প্রথমেই রাজউককে তার গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে, তুলকালাম কিছু না করে ভবনগুলোতে নির্মাণ ত্রুটি, যদি থাকে, সারাতে ভবন মালিককে বাধ্য করতে হবে। ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীদেরও অন্তত অগ্নিনিরাপত্তার জরুরি বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। আবহাওয়া বিভাগের মতো দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলেও, ফায়ার সার্ভিস গত ১০ বছরে, জনবল ও ইকুইপমেন্টÑ দুদিক থেকেই, অনেক উন্নত হয়েছে। তারপরও তাদের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সরকারকে তা পূরণ করতে হবে। সর্বোপরি, ব্যাপক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে আমরা ১৫-২০ বছর আগেও অসহায় ছিলাম, কিন্তু আজ তা মোকাবেলার প্রশ্নে আমরা রোল মডেলের মর্যাদা পাই। দুর্ঘটনাপ্রবণ পোশাক শিল্পকেও আমরা এখন অনেকাংশেই নিরাপদ করতে পেরেছি। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, জনগণের দিক থেকে একটা উত্তরোত্তর চাপ ছিল বলেই আমরা এসব পরিবর্তন সম্ভব করতে পেরেছি।