দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘মাদক সংক্রান্ত অপরাধ দুদকের আওতাভুক্ত নয়। তারপরও আমরা মাদক ব্যবসার মাধ্যমে যারা অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছে তাদের তালিকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে চেয়েছি। তারা প্রথম যে তালিকা দিয়েছিল তাতে তিন শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর নাম ছিল। কিন্তু অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেল নাম-ঠিকানার কোনো মিল নেই। আমরা আবার তাদের কাছে তালিকা চাইলাম, তারা নতুন যে তালিকা দিয়েছে সেটি অনুসন্ধান করে আমরা ১২ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। কমিশনের মামলায় তাদের অনেকে জেল খাটছেন।’ গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) অডিটোরিয়ামে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ‘বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও মাদকাসক্তি : বর্তমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইকবাল মাহমুদ এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি , মাদক , দুর্নীতি, সন্ত্রাস এগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক গণসচেতনতার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমন্বিত এবং সম্মিলিত উদ্যোগেরও কোনো বিকল্প নেই। আমরা উন্নয়ন করছি এ কথা সত্য, তবে মাদক এবং দুর্নীতি নির্মূল না করে উন্নয়ন করলে তা টেকসই নাও হতে পারে।’
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এমন হয়েছে যে, আমরা যা জানি তা মানি না, আবার আমরা যা বলি সেটা বিশ্বাস করি না। এ যেন নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা। এমন হওয়ার কথা ছিল না।’
এ সময় তিনি নিজ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আট-দশ দিন আগে মৃত এমন একটি মেয়ের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। সেখানে গিয়ে আমি জানলাম, মেয়েটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল। তবে সে নেশা করত। মাদকাসক্ত আর হতাশা থেকে সে আত্মহত্যা করেছে। মাদকের কারণে ওই মেধাবী ছাত্রী পৃথিবী থেকে করুণ বিদায় নিয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইকবাল মাহমুদ বলেন, তোমাদের কাছে ফেইসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে। আমরা যখন দেখি এই ফেইসবুকে সম্ভাবনাময় কোনো তরুণ সকালে প্রেম করছে, দুপুরে ফেইসবুকে বিয়ে এমনকি ঐ ফেইসবুকেই অনাগত সন্তানদের সম্ভাব্য নাম রাখা হচ্ছে, তারপরই ভেঙে যাচ্ছে প্রেম। অর্থাৎ প্রেম, বিরহ, নেশা তারপর চরম হতাশা এবং জীবন নামক স্বপ্নের মৃত্যু। হতাশায় নিমজ্জিত এমন প্রজন্ম সৃষ্টি হোক তা আমরা চাই না। সিদ্ধান্ত তোমাদেরই নিতে হবে।’
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যখন ২০১৬ সালে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করি তখন জানতে পারি, ঢাবির কতিপয় শিক্ষার্থীও মাদকাসক্ত। জাতির এই শেষ আশ্রয়স্থলেও যদি নেশা চলে আসে, তবে আমরা যাব কোথায়? অথচ একসময় সিভিল সার্ভিসসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদের চাকরিতে ঢাবির শিক্ষার্থীরাই প্রাধান্য পেত। সে অবস্থাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রদের উদ্দেশে ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আসুন আমরা মাদককে না বলি, আমরা দুর্নীতিকে না বলি, আমরা আমাদের মেধা ও মননের সর্বোচ্চ বিকাশ সাধন করি।’
ঢাবির ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তর-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মেহ্জাবীন হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা মানস-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী। মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে ৭৫ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে এবং এসব মাদকসেবীর মধ্যে ৮০ শতাংশই যুবক, তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। ৫০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। অর্থাৎ মাসে ৬০০ কোটি টাকার মাদক ব্যবসা হয়।