সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হলের এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের মারধরের অভিযোগ জানাতে গিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এস এম হলে এ ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন নুরসহ ১০ থেকে ১৫ জন। ওই সময় তাদের পাশেই এস এম হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে নুরের পদত্যাগ দাবি করেন।
গত সোমবার গভীর রাতে এস এম হলের আবাসিক ছাত্র ফরিদ হাসানকে মারধর করেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। হামলার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে ফের হামলার শিকার হন ফরিদ, তার সঙ্গে থাকা ঢাবির ভিপি নুর, শামসুন্নাহার হলের ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ বেশ কয়েকজন। ওই সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ভিপি নুরকে দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। তারা নুর ও সঙ্গীদের ডিমও ছুড়ে মারেন। তাদের মারধরে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হন ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহরাব হাসান, হাবিবুল্লাহ বেলালীসহ কয়েকজন।
গত সোমবার রাতে মাদক সেবন ও ইসলামী ছাত্রশিবির করার অভিযোগে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী ও উর্দু বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র ফরিদ হাসানকে মারধর করেন এস এম হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাৎক্ষণিকভাবে ঢামেকে ভর্তি করার পর তার মাথায় ৩২টি সেলাই লাগে। ফরিদের অভিযোগ, ওই রাত সাড়ে ১১টায় হলে নিজের কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। ওই সময় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা তার কক্ষে গিয়ে টানাহেঁচড়া করে তাকে হলের ডাইনিংয়ে নিয়ে যান। সেখানে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) জুলিয়াস সিজার, হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান পিকুলসহ কয়েকজন তাকে হলে থাকার সাহস কে দিয়েছে জিজ্ঞাসা করে মারধর শুরু করেন।
মারধরের অভিযোগ থাকা হল সংসদের জিএস জুলিয়াস সিজার বলেন, ‘ফরিদ মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। সোমবার রাতে হল সংসদের সভায় মাদক ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গৃহীত হয়েছে। তাই ফরিদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতির প্রথম প্রয়োগ হয়েছে। তবে তাকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি, ভদ্রভাবে হল ছাড়তে বলা হয়েছে। উত্তেজিত হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে মারধর করে থাকলে সেটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিষয়।’
এ বিষয়ে এস এম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুল আলম জোয়ার্দার বলেন, ‘ফরিদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গতকাল বিকেল ৪টায় ফরিদের ওপর হামলার প্রতিবাদে টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন হয়। এতে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরসহ উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি বেনজির, কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, সোহরাব হাসানসহ অনেকে। নুরুল হক নুর হামলার সঙ্গে জড়িতদের তিন দিনের মধ্যে সিন্ডিকেট মিটিং ডেকে বহিষ্কার করার দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে এস এম হলে যান তারা।
গতকাল বিকেল ৫টার দিকে সঙ্গীদের নিয়ে ভিপি নুর এস এম হলে প্রবেশ করেন। হলে প্রবেশ করার পরপরই হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপসের নেতৃত্বে তাদের অবরুদ্ধ করা হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত শামসুন্নাহার হলের ভিপি ইমি বলেন, ‘আমরা হল প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে স্মারকলিপি দিতে এলে তারা আমার গায়ে হাত দেয়। এ সময় আমাদের সবাইকে ডিম ছুড়তে থাকে ও ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর ও সমাজেসেবা সম্পাদক আকতার হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।’ অরণি সেমন্তি খান বলেন, ‘হলে গেলে আমরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হই। আমাকে লাথি মারা হয়েছে এবং আমার গায়ে ঘুষি মারা হয়েছে এবং বিভিন্ন রকমের আজেবাজে কথা বলা হয় আমাদের।’ সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে হল প্রাধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম জোয়ার্দার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ৭টার দিকে নুর ও অন্যান্যকে নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। এই সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আবার ডিম নিক্ষেপ করেন। এর শিকার হন ছাত্র ফেডারেশনের নুরসহ উপস্থিত অনেকেই।
হামলার বিষয়ে নুর বলেন, ‘ফরিদের ওপর হামলার প্রতিবাদে প্রক্টরকে প্রতিবাদলিপি দিয়ে আমরা হল প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিতে যাই। এ সময় ছাত্রলীগের হল কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতাকর্মীরা আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। তারা আমাদের আটকে রাখে। প্রভোস্ট স্যার যখন আমাদের নিয়ে বের হয়ে আসে তখন তারা আমাদের লাঞ্ছিত করে।’
ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হল সংসদের ভিপি কামাল হোসেন এসব ঘটনা মিথ্যা অভিযোগ করে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীকে বাঁচানোর জন্য তিনি (নুর) হলে এলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ডিম নিক্ষেপ করেছে।’
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। হল প্রাধ্যক্ষকে এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি। মেয়েরা কেন ছেলেদের হলে গিয়েছে, সে বিষয়েও উনারা দেখবেন।’