২০২০ সালের মধ্যে দেশে ১ লাখ প্রশিক্ষিত চালক এবং ১ হাজার উচ্চমানের প্রশিক্ষক তৈরির জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সুপারিশ অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ ‘বিআরটিএ’-কে এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এই প্রকল্পে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি ‘ড্রাইভিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই স্কুলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চালাতে ইচ্ছুকদের ‘চার মাস মেয়াদি’ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং এজন্য কোনোরকম ফি দিতে হবে না। বরং প্রণোদনা হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের চার মাসে ৯ হাজার টাকা ভাতা এবং প্রশিক্ষণকালে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে। দক্ষ চালক ও প্রশিক্ষক তৈরির জন্য প্রতি জেলায় সরকারি ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠার এই প্রকল্পের প্রস্তাবসহ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১১১ দফা সুপারিশ করেছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল।
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সুপারিশগুলোর মধ্যে সরকারি ড্রাইভিং স্কুলের পাশাপাশি নতুন ও মানসম্মত বেসরকরি ড্রাইভিং স্কুল স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ দেওয়ার জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে গাড়ি চালনার পেশায় নারীদের বেশি সংখ্যায় উৎসাহিত করা। গাড়ি চালানোর সময় নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি নিয়ম মেনে চলেন এবং কম ঝুঁকি নেন বলে সরকারি ড্রাইভিং স্কুলগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। আর চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দেশে মানসম্মত প্রশিক্ষকের ঘাটতি মেটাতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও সরকারি পরিবহন পুলের অবসরপ্রাপ্ত চালকদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে চালক ও প্রশিক্ষকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস ও ড্রাইভিং ম্যানুয়াল রচনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময়ে যেসব পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন, তাতে গাড়িচালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব ও যথাযথ লাইসেন্স না থাকার কথা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। কিন্তু দেশে চালকদের লাইসেন্স দেওয়া এবং পরিবহনের ফিটনেস তদারকির ব্যবস্থাটি খুবই ত্রুটিপূর্ণ। দেশে প্রায় ৩৫ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণের জন্য নিবন্ধিত ড্রাইভিং স্কুল আছে মাত্র ১২৩টি, যেখানে মাত্র ১৭৯ জন ড্রাইভিং ইনস্ট্রাক্টর বা প্রশিক্ষক রয়েছেন। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিবন্ধিত ৩৫ লাখের বাইরে নিবন্ধনহীন বা একই নম্বর ব্যবহারকারী গাড়িসহ আরও অন্তত ১৫ লাখ যানবাহন রয়েছে। কিন্তু দেশে এত লাইসেন্সধারী চালকই নেই। গত জুন পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে বিআরটিএ অনুমোদিত চালক ১৯ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে পেশাদার চালক ৮ লাখের বেশি এবং অপেশাদার ১০ লাখের বেশি। পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে আরও অন্তত ২০ লাখের মতো অবৈধ লাইসেন্সধারী বা ভুয়া চালক রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে নৈরাজ্য কমানো ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রশিক্ষিত চালক ও দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরির এই উদ্যোগ অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। এখন সরকারি এই ড্রাইভিং স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে পরিচালিত হবে সেটাই দেখার বিষয়। কেননা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি হলে বাস্তবায়নের কাজটি বিঘ্নিত হতে পারে। তাই পরিকল্পিত এই ড্রাইভিং স্কুলগুলোতে যোগ্য প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং সত্যিকার অর্থেই পেশাদার চালক হতে চান এমন আগ্রহীদেরই প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করাটা জরুরি। একই সঙ্গে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন এই প্রকল্পটি যাতে কোনোভাবেই পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিণত না হয়। নয়তো এই প্রকল্পও সরকারি সুযোগ-সুবিধার ভাগ-বাটোয়ারার একটি ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিতে নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এই প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নে এগিয়ে এলে তা দেশে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করা যায়।