ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের জীবন

কলারোয়ার টালিপাড়া পার হয়ে নাক বরাবর দু-কিলোমিটার হেয়ারিং, মন ভেঙে দেয়। ইটের পথ, ছাড়তেই কাদাগলি। ফের এবড়ো-খেবড়ো দলাপাকানো নয়া হেয়ারিং। পথের শেষ দেখা যায় না। জিজ্ঞাসা করি ভাই দৌলুইপুর কতদূর! মোটরসাইকেল থেকে ছুড়ে দেওয়া কথা পথিকরা ঠিক মতো ধরতে পারেন না। সাধুভাষায় পাল্টা প্রশ্ন করেন, দিয়ারার কতা বলচেন? এয়িতো ম্যালা দূর আছে। অগত্যা থামতে হলো, তারা খোলাসা করেন উদিকে, সামনে যাতি থাকেন। উ গ্রাম পার হয়ি পরের গ্রামে গি ব্রিজ পাবেন... বর্ণনা শেষ হয় না। মানে  চুনোপুঁটির মন নিয়ে কাজ হবে না, দূর আছে। আগে দিয়ারা তারপর দৌলুইপুর। সেখানে পাঁচ-সাত ঘর ভগবানিয়া বাস করেন এটুকুই তথ্য। ফসলি হাওয়ার ঢেউ লাগে। দু-ধারে ভিড় করে ঠাসা আছে গেরুয়া আবাদ। গ্যাপ দিয়ে পাঁচমিশালি চাষ করে রেখেছে কৃষকরা। ঢিলেঢালা চালচলনে বয়ে চলেছে কাঁচাপথ। পাথার শেষ করে গুটিধরা গ্রামে ঢুকে পড়ি। ততক্ষণে বাতাসে রং লাগে, উড়ে উড়ে সরে যায় ফসলের ওড়না।

বেশিক্ষণ চলতে হলো না। দিয়ারা বাজার পেয়ে গেলাম। ভালো স্ন্যাকস বলতে হাবিজাবি বিস্কুট আর ক্যাটকেটে চানাচুর। নোন্তা বিস্কুট চা’য়ে ভিজিয়ে খেয়ে নিই। যেতে হবে আরও দূরে। ভুলোপথে ইনিয়ে-বিনিয়ে যতক্ষণে দৌলুইপুরে পৌঁছলাম ততক্ষণে শহিদুলরা দুপুরের গোসল সেড়ে নিয়েছেন। দুপুরের কড়া হলুদে ঝিম ধরে আছে ঝুপড়িপাড়া। শুরুতে যা হয়, তাই হলো। চোখে সন্দেহ রেখে শর্টকাটে প্রশ্নের জবাব দিয়ে উপস্থিতরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। জমাট আবহাওয়া ফ্রি করার পদ্ধতি আছে! আজগুবি এক কা- করতে হয়। আঁচলটানা এক মহিলার দিকে যার পর আপনচোখে তাকালাম, বললাম আপনি ভালো আছেন? কোল থেকে গান্দা বাচ্চাকে নামিয়ে আনোয়ারা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। পরিবেশটা সহজেই যেন সহজ হয়ে গেল। শ্যামলা পুকুরপাড়েই বেঞ্চ পাতা হলো, আয়েশের জন্য বালিশ এলো, হাতপাখা এলো। শুধু ভগবানিয়া বললে ভুল হবে। লাগোয়া পনের ঘর লোক নিয়ে খিচুড়িপাড়া। মিনিট পাঁচেকেই অর্ধেক মানুষ পুকুরপাড়ে নেমে এলো। মুসলমান সম্প্রদায় থেকে শুরু হলেও পরে নদীয়ার ঘোষপাড়ার কর্তাভজা’র সঙ্গে তাদের সমন্বয় ঘটেছিল।

ফলে নাম ছাড়াও আচার-নিষ্ঠাতে হিন্দু-মুসলিম দু’য়েরই মিল-অমিল আছে। মুসলমান গুরুযোগে দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্যরা ভগবানিয়া আর হিন্দু গুরুর শিষ্যদের লোকপরিচয় ভাগবজ্জন। আউলচাঁদ হলেন ধর্মপ্রবর্তক। মূলগ্রন্থÑ সহজতত্ত্ব প্রকাশ। সহজতত্ত্বে আছে ৩০ আজ্ঞা এবং ৬ নীতি। ৬ নীতি মানেÑ মিথ্যা বলিবে না, সদা সত্য বলিবে, পরস্ত্রী গমন করিবে না, মদ পান করিবে না, ডিম মাংস ভক্ষণ করিবে না, উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করিবে না। অন্যথা করিলে সম্প্রদায় থেকে খারিজ হয়ে যাবে। বাণীবদ্ধ সহজতত্ত্ব প্রকাশকে ভগবানিয়ারা হাদিস গ্রন্থের মতো সম্মান ও সংরক্ষণ করেন। তাদের বিশ্বাস আউলচাঁদ মরার পর পুনরায় তিনি সতীমায়ের গর্ভে দুলালচাঁদ নাম নিয়ে জন্মলাভ করেছেন। সত্য ত্রেতা দাপর কিংবা কলি-তে অভিন্ন ব্যক্তি যেভাবে অবতাররূপে রাম-নারায়ণ-কৃষ্ণ-গৌরাঙ্গ; তেমনি আউলচাঁদের-ই অবতারিত রূপ দুলালচাঁদ। পরবর্তীকালে দুলালচাঁদ অবশ্য কর্তাভজার উদ্বোধন করেন। ফলে সম্প্রদায়ে নতুন করে কর্তাভজা তথা হিন্দু আচারাদি মিশ্রিত হতে থাকে। সহজতত্ত্বের আলাপ শেষ না হতেই বড় ভাই সিরাজুল কথা কেড়ে নিয়ে মাঝখান থেকে শ্লোক আওড়ালেন

নয়নে দেখিনি যারে খুঁজিব কেমনে তাঁরে

সিরাজুল নিজ থেকেই ব্যাখ্যায় নামেন। গু মানে অন্ধকার আর রু অর্থ জ্যোতি। গুরুই তো মনের অন্ধকার দূর করবেন! জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটাবেন। ধর্মমতে সকল ধর্ম সত্য, সকল আচার সত্য, সকল ধর্মগ্রন্থ সত্য। প্রত্যেকজনকেই আমরা একজনার সৃষ্টি মনে করি।

আনুমানিক ৪০০ বছরের পুরনো এ ধর্মের ধর্মকথা হলো গুরু সত্য। গুরুর ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল হলেও তারা বাউলদের মতো একবারেই গুরুসর্বস্ব নন বরং গুরুকে আশ্রয় করে তারা সৃষ্টিকর্তাকেই ডাকেন। কেবল ‘মালিক’ শব্দ দিয়েই তারা সৃষ্টিকর্তাকে জপ করেন, প্রার্থনা করেন। স্বজাতির কেউ মরলে সমাজজনেরা কাফন পরিয়ে কবর দেয়। জানাজায় সুরা-কেরাতের পরিবর্তে চলে মন্ত্র পাঠ। সমবেতরা গামছা গলায় পেঁচিয়ে আঁচল ধরে জোড়হাতে মালিকের কাছে যোগে প্রার্থনা করেন

এ কাইকের
গাফিলি তসকির কসুর শব
মাফ করো হে প্রভু

বোশেখের দোলপূর্ণিমায় রথযাত্রা দিয়ে শুরু হয় ধর্মউৎসব। বাচ্চারা নতুন কাপড়-চোপড় পরে। বাড়িতে ক্ষীর পায়েস হয়। অধরা ধামে আউলচাঁদের আবির্ভাবের দিনকে লক্ষ্য মেনে তারা একসঙ্গে আবির ছুড়ে আনন্দ করে। রথযাত্রা ছাড়াও সতীমায়ের মন্দিরে আষাঢ়ের

কৃষ্ণপঞ্চমীতে ‘ফলছোড়া’ উৎসব লাগে। তখন ফের আনন্দ জাগে।

একটানা ধর্মালাপ শুনতে গিয়ে কিছুটা অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। এতক্ষণে বৌ-ঝিরা আরও কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেছেন। তারাও এবার সবলে বকে যাচ্ছেন। সাবজেক্ট পাল্টাতে না পারলে, চলতেই থাকবে। খামোখাই খাপছাড়া প্রশ্ন করে ফেললাম, আপনারা নাকি কঠিন নিয়মকানুন মেনে চলেন? রহমান মন্ডলের স্ত্রী নিস্তারি বালা মুখ খুললেন কিছু মানা-ছিনা তো আছেই! যেমন আমরা বাড়িতে মুরগি পালিনে। কারও পাতের এঁটো খাইনে। শুধু নিস্তারি একা নন। অন্য সবার বর্ণনায় যা পাওয়া গেল তা সত্যি সত্যি কঠিনই বটে। যেমন অসুখে পড়লে তারা কোনো প্রকার ওষুধ সেবন করেন না। ধর্মমতে সেবনের বিধান না থাকায় শহিদুলের মামাশ্বশুর মতলব গাজী দীর্ঘদিন রোগেভুগে শেষে বলতে গেলে চিকিৎসা বিনেই মারা গেছেন। শহরে ফেরার পর এ নিয়ে অ্যাডভোকেট কিনুলাল গায়েনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।

অভিজ্ঞতার বরাত দিয়ে তিনি বললেন আমার এক নিকটাত্মীয় একবার মৃত্যুমুখে পড়েছিলেন। ইনজেকশন দেওয়া যাচ্ছিল না। শেষ ভরসা হিসেবে আমাকে ডাকা হলো। গিয়ে দেখি অবস্থা ব্যাপক খারাপ। তাকে বুঝিয়ে বললাম, দেখুন ইনজেকশন না দিলে আপনাকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু তিনি কোনোমতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমিও নাছোড়। অগত্যা চাপাচাপির এক পর্যায়ে বৃদ্ধ নিরুপায় হলেন ‘গুরুকে কী জবাব দেব, বাবা ইনজেকশন দিয়ে আমার রক্তকে তোমরা অপবিত্র করে দিয়ো না।’ কিনুলাল গায়েন একটানা বর্ণনা করে নীতিকথায় ফিরে এলেন আমরা মনে করি, সত্যকথা বললে, পাপকর্ম না করলে রোগ আসবে না। রোগ এসে গেলে বুঝতে হবে কোনো ক্রটি হয়েছে। কিনুলালরা যেমন সাতপুরুষ ধরেই ভগবানিয়া। তিনি নিজেও বিশ্বাস করেন গুরু যদি জলে মন্ত্র পড়ে দেয় তবে মন্ত্রজল খেয়েই অসুখ সেরে যাবে। কেবল ওষুধের বেলাতেই নয়, ধর্মবিধান মানতে আরও কতক নিয়মকানুন মেনে চলেন তারা। শহিদুলের বিশ্বাসটা আরও প্রগাঢ় রোগ যদি মালিক ভালো না করে তবে তো ভালো হবে না! মালিকে বিশ্বাস হারায়ে যাওয়ার কারণে আমরা ওষুধ খাই। মালিক অসুখ দিয়েছে, মালিকই ভালো করবে। ডাক্তারের প্রয়োজন নাই।

 লেখক : কবি ও লালন গবেষক