শতবর্ষী দুধের আড়ত

রাজধানীর গুলিস্তান পেরিয়ে নবাবপুর রোডে গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে শতবর্ষী ‘রথখোলা দুধের আড়ত’। চারপাশের দালানকোঠার চাপে এখনো এক তলা দুটি ঘর যেন টিকে আছে রীতিমতো যুদ্ধ করে। সন্ধ্যা নামতেই প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে দুধের আড়ত। গোয়ালারা আসেন দুধ নিয়ে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা দুধ ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করেন তাদের জন্য।

বঙ্গবাজার থেকে দুধ কিনতে এসেছেন গৌতম ঘোষ। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, প্রতিদিন ৪০-৫০ কেজির মতো দুধ লাগে। এগুলো নিয়ে প্রতি গ্লাস ২০-৩০ টাকা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চানখাঁরপুল এলাকায় রাতে বিক্রি করেন।

রথখোলার এ আড়তে সন্ধ্যা নামতেই দেখা গেল ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকা থেকে কচুরিপানায় মুখ বন্ধ করা ড্রামে ও কলসে ভরে দুধ নিয়ে আসেন গোয়ালারা। এখন দুটি ঘর থাকলেও একসময় আড়তে ৭-৮টি ঘর ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। পাশের মিষ্টির দোকানের সামনে কথা হয় আলী আহাম্মদ নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন চারদিকে দালানকোঠায় ভরে গেছে। একসময় আড়তে ভোর থেকে সারা দিন দুধ বিক্রি হতো। এখন শুধু সন্ধ্যার পরই বিক্রি হয়। চলে রাত ১টা-২টা পর্যন্ত।’ রথখোলার এ দুধের আড়ত কবে থেকে শুরু হয়েছে কেউ জানাতে পারেননি। ভ্যানচালক আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে দুধ বিক্রি হয়। তবে কত সাল থেকে বিক্রি শুরু হইছে কইতে পারুম না।’

জানা যায়, দুধ নিয়ে পাশের একটি মন্দিরে ভক্তরা পূজা দিতে আসত। এর পর থেকেই সেখানে ধীরে ধীরে দুধের বেচাকেনা জমে ওঠে। পুরান ঢাকার মানুষের দুধের চাহিদা মেটাতে একসময় জমজমাট হয়ে ওঠে এ আড়ত। গড়ে ওঠে বেশ কিছু দোকান। এ দুধের আড়তকে ঘিরেই মরণচাঁদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ইসলামিয়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মতো প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান তৈরি হয়েছে বলেও জানা যায়।

ইসলামপুর থেকে দুধ কিনতে আসা সঞ্জয় কুমার দাস বলেন, ‘আগে তো গ্রামের কৃষক তার গরুর দুধ এনে এখানে বিক্রি করতেন। এখন অনেকেই খামার তৈরি করেছেন। বুড়িগঙ্গার ওপারের গ্রামগুলোতে এরকম অনেক খামার রয়েছে। সেখানকার দুধ বড় বড় কোম্পানি এবং মিষ্টির দোকানগুলো নিয়ে নেয়। যার জন্য তারা এই আড়তে আসেন না। মিষ্টির দোকানে দুধের চাহিদা কম থাকলে আড়তে দুধের সরবরাহ বেশি থাকে। তখন দুধের দামও কম থাকে। ৪০-৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। যখন মিষ্টির দোকানগুলোর চাহিদা বেশি থাকে তখন দুধের দাম ৮০-৯০ টাকা কেজি হয়ে যায়। আমাদের মতো খুচরা ব্যবসায়ীদের তখন দুধ কিনতে হিমশিম খেতে হয়। এখানে দুধ বিক্রি হয় নিলামের মাধ্যমে। প্রতি মণ দুধ থেকে আড়তদার পান ৫০ টাকা এবং এক লিটার দুধ।’

এই মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে লড়াই করে রথখোলায় টিকে আছে নুরু মিয়া আর লালজি ঘোষের আড়ত। দুটি দোকানেই খাঁটি দুধ বিক্রি করা হয় বলে জানান অনেকে। গৌতম ঘোষ বলেন, ‘এখানে যদি ভেজাল দুধ নিয়ে কেউ আসে তবে সবাই মিলে গণধোলাই দেওয়া হয়। এই ভয়ে কেউ ভেজাল দুধ নিয়ে আসে না।’