চৈত্রের কড়া সূর্য ছেপে হঠাৎ গোমড়া ঢাকার আকাশ। অগোছালো দমকা বাতাসের সঙ্গে কালো মেঘের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি যখন শুরু তখন বেলা ৩টা। এর কিছু পরই শুরু হয় মুষলধারে। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এরই মধ্যে সড়ক, গলিপথ, বাসাবাড়ির সামনে থইথই পানি। কোথাও হাঁটু কোথাও বা কোমর। ঘাম ঝরানো কড়া রোদকে ফাঁকি দিয়ে শেষ বসন্তের এ বৃষ্টি রাজধানীতে স্বস্তি এনে দিলেও ভোগান্তি বাড়িয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ।
গতকাল সোমবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে তিন দফার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় রাজধানীর মৌচাক, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল, যমুনা ফিউচার পার্ক, কারওয়ানবাজার, মিরপুর ও পুরান ঢাকাসহ অনেক এলাকা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার আগে এক ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বর্ষণে নজিরবিহীন এ জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত ঢাকায় এমন বৃষ্টিপাত হবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক।
সন্ধ্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে জলাবদ্ধতার অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসবের নিচে ব্যবহারকারীরা জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের দুর্বলতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, ইব্রাহীমপুর, কালশী, পাইকপাড়া, জোয়ার সাহারা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সড়ক, জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, মতিঝিল, পল্টন এলাকার বিভিন্ন সড়কে জলজট ও জলাবদ্ধতার কারণে অন্তহীন দুর্ভোগে পড়েন এসব এলাকার মানুষ। এর সঙ্গে নির্মাণকাজের খোঁড়াখুঁড়িতে জল-কাদায় একাকার হয়ে যায় ঢাকার রাজপথ-অলিগলি। পরিবহন সংকট এ দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ।
মিরপুর সাড়ে এগারোর প্রধান সড়কে কোমর পানিতে লোকজনকে চলাচল করতে দেখা গেছে। মৌচাক মার্কেটের নিচে ঢুকে পড়ে পানি। মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এইট্যা নিয়া নতুন কিছু কওনের নাই। প্রত্যেকবার পানির লগে যুদ্ধ কইর্যা ব্যবসা করতাছি। সিটি করপোরেশন ওয়াসা খালি খোঁড়ে আর খোঁড়ে, কাম কিছু হয় না।’ বাংলা মোটর এলাকার বাসিন্দা নুরে সিদ্দিকী বলেন, ‘মেট্রোরেলের কাজে বড় রাস্তা ছোট হয়ে গেছে, গলিগুলাও খোঁড়াখুঁড়িতে বেহাল। এখন দ্যাখেন হালকা পানিতে কী অবস্থা। এইট্যা রাজধানী শহর হইলো!’
বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় গণপরিবহন সংকট দেখা দিলেও উল্টো চিত্রও দেখা গেছে। প্রেস ক্লাব, শাহবাগ, বাংলা মোটর, ফার্মগেট এলাকায় ব্যাপক যানজটে পড়ে মানুষ। রামপুরার বাসিন্দা কবির খান বলেন, ‘ফার্মগেট থেইক্যা শাহবাগ আইতে এক ঘণ্টা লাগল। ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে মেট্রোরেলের কাজে এই দশা হইছে।’
ঢাকার দুই সিটির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার ড্রেনেজ লাইন রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াসার ৩৬০ কিলোমিটার ড্রেনেজ লাইন রয়েছে। এ ছাড়া রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, বেসরকারি আবাসন কোম্পানির আলাদা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরও জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে কয়েকটি বড় কারণকে দায়ী করেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীব। গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মোটামুটি তিনটি কারণে আমরা আগে থেকে নিশ্চিত ছিলাম এবার বর্ষায় ঢাকায় যে দুর্ভোগ হবে তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এক. বড় দুটি প্রকল্পের কাজের জন্য অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। দুই. ২ বছর ধরে অনেক আলোচনার মধ্যেও ঢাকা সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া। তিন. ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন যেসব অ্যাডহক প্রকল্প নিয়েছিল সেগুলো বাস্তবতার মুখ না দেখা।’
তিনি বলেন, ‘বড় প্রকল্প শুরুর আগে নগরীর জলাবদ্ধতা কীভাবে দূর করা হবে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। আমরা বলেছিলাম ঢাকার অন্তত ২৬টি খালের আবর্জনা পরিষ্কার এবং চারপাশের নদীর সঙ্গে এগুলোর সংযোগ তৈরি করতে হবে। বক্স-কালভার্টগুলোর আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। যাতে পানি বের হতে পারে। কিন্তু এগুলো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এবার যে দুর্ভোগ হবে তা নজিরবিহীন।’