ভারতে ভোটযুদ্ধ শুরু আজ

ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে ভোট শুরু  হয়েছে আজ বৃহস্পতিবার। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫৪৩টি আসনে আইনপ্রণেতা নির্বাচনে ৭ দফায় প্রায় ১০ লাখ ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ৯০ কোটি ভোটার। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৮৪১টি দল। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আট হাজারের বেশি প্রার্থী।

আজ প্রথম ধাপে ১৮টি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯১টি আসনে ২ হাজার ২০২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। এবারের নির্বাচনের ভোট শেষ হবে আগামী ১৯ মে। ফল প্রকাশিত হবে ২৩ মে।

প্রথম ধাপের নির্বাচনে ৯১টি আসনে লড়ছেন ১ হাজার ২৭৯ প্রার্থী। তাদের মধ্যে ২১৩ জনের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, নারী নির্যাতনসহ ফৌজদারি বিভিন্ন মামলা রয়েছে। ৯১টি আসনের ৩৭টি কেন্দ্রে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

প্রথম ধাপের নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগেই সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার নিষিদ্ধ করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। তাদের নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো দলই ভোট শুরু হওয়ার আগে আর প্রচার করতে পারবে না। মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক প্রচার ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালানো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি ভারতের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুককে নির্বাচন চলাকালে কোনো দলের বিজ্ঞাপন প্রচার না করতে বলা হয়েছে। তবে বিগত নির্বাচনের মতো এবারও ভোট পরবর্তী জরিপের সুযোগ থাকছে। যদিও এ নিয়ে কংগ্রেসসহ অধিকাংশ বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বলেছে, এ ধরনের জরিপ পরবর্তী ধাপের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে।

আজ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে ভোট হচ্ছে। এই দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৮ প্রার্থী। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, বাম দল ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপিসহ অন্য কয়েকটি ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এই দুটি আসন ছিল বাম দল ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপির দখলে। পরে আসন দুটি চলে যায় তৃণমূলের হাতে। এবার এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপি প্রার্থীর। আলিপুরদুয়ার আসন ভুটান ও আসাম এবং কোচবিহার আসনটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী। এই দুটি কেন্দ্রে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিপুল লোকের বাস। বিপুলসংখ্যক চা-শ্রমিকও বাস করেন। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের পর ভারতের নাগরিক হওয়া ভোটাররা এখন কোচবিহার জেলার অধিবাসী। সে হিসেবে তারা প্রথমবারের মতো লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেবেন। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে এবারও আধিপত্য ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। সে ক্ষেত্রে ফের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন মমতা ব্যানার্জি। তবে আসন সংখ্যা কমতে পারে তৃণমূলের।

অন্ধ্রপ্রদেশের ২৫টি লোকসভা ও ১৭৫টি বিধানসভা আসনে একসঙ্গে ভোট হচ্ছে। এই রাজ্যে ক্ষমতায় আছে তেলুগু দেশম পার্টি। দলের প্রধান ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সভাপতি ওয়াই জগনমোহন রেড্ডিকে নিয়ে তিনি শুরু থেকেই সমালোচনামুখর ছিলেন।

তেলেঙ্গানার ১৭টি লোকসভা কেন্দ্রে নির্বাচন হবে। হায়দরাবাদ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন চারবারের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। নিজামাবাদ কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের মেয়ে কে কবিতার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন ১৭০ জন কৃষক। তেলেঙ্গানা থেকে এবার ভোটে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী রেনুকা চৌধুরী এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি উত্তমকুমার রেড্ডি।

উত্তরপ্রদেশে ভোট হবে ৮টি লোকসভা আসনে। এখানে ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় লোক দলের (আরএলডি) জোটের লড়াই হবে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাহারানপুর, কৈরানা, মুজফ্ফরপুরসহ সবকটি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। মুজফ্ফরনগর কেন্দ্রে বিজেপির সঞ্জীব বলওয়ানের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন আরএলডির প্রধান অজিত সিং। তার ছেলে জয়ন্ত চৌধুরী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সত্যপাল সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন বাগপত আসন থেকে। গাজিয়াবাদ ও গৌতম বুদ্ধ নগর থেকে বিজেপি টিকিট দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভিকে সিং ও মহেশ শর্মাকে।

উত্তরাখণ্ডের পাঁচটি লোকসভা আসনে ভোট হচ্ছে। এই রাজ্যের প্রতিটি আসনে বিগত নির্বাচনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু এবার সেখানে বিজেপিকে হারাতে তৎপর কংগ্রেস। তেহরি থেকে প্রীতম সিং, নৈনিতাল থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হরিশ রাওয়াত এবং মনীষ খান্ডুরিকে পাউরি থেকে মনোনয়ন দিয়েছে কংগ্রেস।

উড়িষ্যার চারটি লোকসভা এবং ২৮টি বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকাও রয়েছে। আসামের তেজপুর, কালিয়াবর, জোরহাট, ডিব্রুগড় এবং লখিমপুরে ভোট হচ্ছে। পাঁচটি কেন্দ্রে মোট ৪১ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে।

মহারাষ্ট্রে সাতটি, বিহারে চারটি, জম্মু-কাশ্মীর, মেঘালয় এবং অরুণাচল প্রদেশের ২টি করে আসনে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। এর বাইরে মিজোরাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, ছত্তিশগড়, নাগাল্যান্ড, সিকিম, আন্দামান-নিকোবর ও লাক্ষাদ্বীপের একটি করে আসনে ভোট চলছে। সিকিমে বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে আঞ্চলিক দল এসডিএফ। আর অরুণাচলে আছে বিজেপি।

ভোট বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ধাপে ১৮টি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯১টি আসনের অধিকাংশ জায়গাতেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ) ও বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) মধ্যে। তবে ছত্তিশগড়, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও উড়িষ্যার কিছু আসনে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জয় পেতে পারে।