শুল্ক ফাঁকি দিতে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে এক শ্রেণির অসাধু আমদানিকারক। বন্ড সুবিধায় কম শুল্কে পণ্য আমদানির ঘোষণায় বেশি শুল্কের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাপড়, পপলিন ফেব্রিকসের পরিবর্তে পর্দার কাপড়, কাগজের বদলে বালু, কাটিং ব্লেডের জায়গায় পলিশড স্টিল স্ট্রাইপড আমদানি হচ্ছে। আবার কখনো ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য এনে শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে তারা। ফলে প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি রোধে কাজ করছে তাদের বিভিন্ন বিভাগ। গোপন তথ্য কিংবা সন্দেহের ভিত্তিতে বিভিন্ন চালান পরীক্ষায় ধরা পড়ছে এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা। এসব ঘটনায় আমদানিকারকের কাছ থেকে ফাঁকি দেওয়া শুল্ক ছাড়াও জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।
তবে অনেক সময় চালান আটকের পর বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরের কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় বলেও জানান তারা।
কাস্টমস সূত্রের তথ্যমতে, মাঝেমধ্যে দু-একটি চালান ধরা পড়ে। আবার তাদের চোখ এড়িয়ে এমন অনেক চালান নিরাপদে বাইরে নিচ্ছে আমদানিকারকের লোকজন। এমন ঘটনায় কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফের কিছু অসাধু লোকজনেরও সম্পৃক্ততা থাকে।
চীন থেকে ৪৮ হাজার ৯৬৪ কেজি ইলেকট্রিক মোটর আনার ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকার তেজগাঁও সার্কেলের মদনপাল লেন এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জাবেদ ট্রেডিং কোম্পানি।
‘এমসিসি চিটাগাং’ নামে কনটেইনার জাহাজযোগে মার্চের শেষ সপ্তাহে ঘোষিত পণ্যের চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। আমদানিকারকের পক্ষে চালান খালাসের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান আর এস করপোরেশন-১।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস আটকে দিয়ে কায়িক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় কাস্টমস। পরবর্তীতে চালানটির কায়িক পরীক্ষা করে কাস্টমসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ শাখা। এতে দেখা যায়, ওই চালানে ইলেকট্রিক মোটরের পরিবর্তে এসেছে সমপরিমাণ ‘বল বেয়ারিং’।
কাস্টমসের এআইআর বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকারক ঘোষিত এইচ এস কোড অনুসারে পণ্যটির নির্ধারিত শুল্ক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে কায়িক পরীক্ষার পর পাওয়া পণ্যের নির্ধারিত শুল্ক ৩৮ শতাংশ। আটককৃত চালানে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে ৪০ লাখ ৩২ হাজার ৩৭৫ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। একইভাবে গত মাসের শেষে চীন থেকে ‘থর্সওয়াইন্ড’ জাহাজে ঢাকার বিজয়নগর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্মরণীর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘আবির অটোসের’ নামে আসে একটি টায়ারের চালান। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ওয়াটারওয়েজ শিপিং এজেন্সিস চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল।
ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য থাকার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমসের এআইআর শাখা অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে চালানটির বি/ই (বিল অব এন্ট্রি) ব্লক করে দেয়। গত ৪ এপ্রিল সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপস্থিতিতে চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়।
এতে দেখা যায়, পণ্যের পরিমাণ ঘোষণার চেয়ে ১৩ হাজার ৩৯১ কেজি বেশি। কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, এ চালানে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করেছিল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
শুল্ক হারে তারতম্য না থাকা সত্ত্বেও ছোটখাটো কারণে পণ্য আটকে আমদানিকারকদের হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি ও বিজিএমইএর পরিচালক এ এম মাহবুব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমান শুল্কের ফেব্রিকসের ক্ষেত্রেও ঘোষণার একটু এদিক ওদিক হলেই আটকে দেন কাস্টমসের অনেক কর্মকর্তা। এতে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কিছু নেই।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কিছুদিন আগে এনভয় গ্রুপের একটি ফেব্রিকসের চালান বেশ কয়েকদিন আটকে রেখেছিল কাস্টমস। পরবর্তী সময়ে কাস্টমস কমিশনারকে বলার পর তার নির্দেশে চালানটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ধরনের ফাঁকিরোধে কাজ করছে।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কিংবা তাৎক্ষণিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো চালান নিয়ে সন্দেহ হলেই তা আটকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর কোনো ধরনের ফাঁকি থাকলে তা শনাক্ত করে নির্ধারিত শুল্ক আদায় ও নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। আবার পরীক্ষার পর যদি ঘোষণার সঙ্গে আমদানি পণ্যের কোনো তারতম্য পাওয়া না যায়, তাহলে তা ছেড়ে দেওয়া হয়। হয়রানির উদ্দেশ্যে নয়, কেউ যাতে রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে সে লক্ষ্যেই কাস্টমস পণ্য খালাসে কড়া নজরদারি রাখছে বলে জানান তিনি।