রমনা বটমূলে বোমা হামলা

১৮ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার

বাংলা বর্ষবরণের দিনে রমনা বটমূলে ২০০১ সালে বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনার ১৮ বছর হয়েছে। এ সময়েও বিচারিক আদালতে শেষ হয়নি বিস্ফোরক আইনে করা মামলার বিচারকাজ। একই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় বিচারিক আদালতে হলেও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিল শুনানি থমকে আছে দুই বছরের বেশি সময় ধরে।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। আহত হন শতাধিক। এ ঘটনায় হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ জঙ্গি মুফতি আবদুল হান্নান (ইতোমধ্যে অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর) ও অপর ১৩ জঙ্গিকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের হয়। চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রুহুল আমিন মুফতি হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেনÑ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা আকবর হোসেন, মুফতি আবদুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মাওলানা আরিফ হাসান সুমন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম, আবদুল হাই, শফিকুর রহমান ও আবু বকর ওরফে সেলিম হাওলাদার পলাতক। আর বাকিরা কারাগারে।

মামলাটি বর্তমানে বিচারপতি রুহুল কুদ্দুসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিচারাধীন। বিচারিক আদালতের রায়ের পর ওই বছরের ২৫ জুন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে আসে। কারাগারে থাকা আসামিরাও আপিল করেন। ২০১৫ সালের ৯ অক্টোবর পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। আর পলাতকদের পক্ষে শুনানির জন্য রাষ্ট্র আইনজীবী নিয়োগ দেয়। ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। কিন্তু এরপর বেঞ্চ বদল হলেও আপিল শুনানি একপ্রকার থমকে আছে। 

মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি আকবরের আইনজীবী মাসুদ রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই সময়ে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরুর পর শুনানি আর এগোয়নি।’ এজন্য রাষ্ট্রপক্ষকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল এ মামলায় শুনানি করবেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ সময় নেয়। মূলত রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতার কারণে একপর্যায়ে হাইকোর্টের এই বেঞ্চ মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন। পরে অন্য একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু শুনানি আর হয়নি।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুনানি শুরু হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের শুনানির জন্য সময়ের আবেদন করেছিলেন তারা। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল তার অসমাপ্ত বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে শুনানি আর না হওয়ায় ওই মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয় হাইকোর্টের এই বেঞ্চ। পরে প্রধান বিচারপতি অন্য একটি বেঞ্চ (বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস) নির্ধারণ করে দিলেও শুনানি শুরু হয়নি। 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন মামলাটি এই বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় আছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার এটি কার্যতালিকায় থাকলেও শুনানি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘নিয়ম হলো, এই মামলার আগের যেসব ডেথ রেফারেন্স মামলা রয়েছে, কার্যতালিকা অনুযায়ী সেগুলোর শুনানি হবে। এ কারণে এ মামলার শুনানি হচ্ছে না। তবে আমরা আশা করছি যেহেতু কার্যতালিকায় আসছে, খুব দ্রুতই শুনানি শুরু করতে পারব।’

আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে হাইকোর্টে এ মামলার শুনানি হচ্ছে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।’ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি এর আগে একটি বেঞ্চে ছিল। এখন আরেকটি বেঞ্চে বিচারাধীন। মামলা একবার ফাইল হলে সেটি তো পড়ে থাকবে না। আশা করি শুনানি আবারও শুরু হবে।’

এদিকে রমনা বোমা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় সাক্ষী না আসায় বিচারে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলাটি এখন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন। ২০১৫ সালে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হওয়ার পর ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সবশেষ ২০১৮ সালের ১৭ মে ২৬ নম্বর সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এরপর ১১ মাস ধরে কোনো সাক্ষী আসেননি। বেশ কয়েকটি তারিখ পার হলেও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষীদের সমন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা আদালতে আসেন না। অনেকের ঠিকানায় সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। সাক্ষীদের সমন তামিল করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু তারাও আমাদের কোনো প্রতিবেদন দেয় না, যেজন্য সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে।’

এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো ব্যর্থতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলায় কিন্তু আমরা সাক্ষী হাজির করেছি এবং রায়ও ঘোষণা হয়েছে। আসামিদের সাজা হয়েছে। বিস্ফোরক মামলায় ৮৪ জন সাক্ষীর সবার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হবে না। আমরা এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণে সচেষ্ট হব। আশা করি কয়েক মাসের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায় ঘোষণা হবে।’