আগাম পাহাড়ি ঢলে বন্যা কিংবা শীতে ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া হাওরের কৃষকদের রক্ষায় শস্যবীমা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। কৃষকদের কাছ থেকে প্রিমিয়াম হিসেবে নামমাত্র টাকা নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ বছরই শস্যবীমা চালু করা হতে পারে। কৃষকদের পক্ষে প্রিমিয়ামের বাকি অর্থ পরিশোধ করবে সরকার। এতে সম্পৃক্ত করা হবে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোকেও। চলতি বছরই সরকারি-বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে শস্যবীমা চালু করার পর পর্যায়ক্রমে তার স্থায়ী রূপ দিতে চায় সরকারি সংস্থা সাধারণ বীমা করপোরেশন।
সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ শাহ্রিয়ার আহ্সান শস্যবীমা চালুর প্রস্তাব করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে বলেছেন, শস্যবীমা হলে আগাম বন্যা, খরা কিংবা তীব্র শীতসহ যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওর এলাকার চাষির কোনো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমার আওতায় থাকা ফসলের আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন কৃষক। তাতে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা যেমন কমবে, তেমনি ত্রাণনির্ভরতাও দূর হবে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষিবীমার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে ভর্তুকি দেওয়ার প্রথা প্রচলিত রয়েছে উল্লেখ করে করপোরেশন বলেছে, ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় সরকারের পক্ষ থেকেই যৌথভাবে কৃষকদের শস্যবীমার প্রিমিয়ামে ৮০ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়। উন্নত বিশ্বেও কৃষিবীমার প্রিমিয়ামে ভর্তুকি দেওয়া হয়। শস্যবীমার প্রিমিয়ামে ভর্তুকি দিতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখার কথাও বলেছেন তিনি।
শস্যবীমা চালু করতে ‘বাংলাদেশের হাওর এলাকায় শস্যবীমা প্রকল্প’ শিরোনামে একটি প্রকল্প নেওয়ার ধারণাপত্র তৈরি করে বলা হয়েছে, সরকার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাওর এলাকার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এ জন্য এই শস্যবীমা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমে সাধারণ বীমা করপোরেশন ও বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে বীমা প্রকল্প চালু করা হবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তত্ত্বাবধানে নীতি-নির্ধারণী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এ বীমা কার্যক্রমের প্রিমিয়ামে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হবে। সেজন্য আসছে বাজেটে সরকারি বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হাওরবেষ্টিত জেলা হিসেবে পরিচিত। এই সাত জেলার মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৯ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর, যা জেলা সাতটির আয়তনের ৪৩ শতাংশ। হাওরের সংখ্যা ৩৭৩। বোরো ছাড়াও হাওর এলাকায় আউশ ও আমন ধান হয়ে থাকে। তবে প্রায় প্রতি বছর বন্যার কারণে হাওর এলাকায় কৃষকদের জানমাল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে কৃষকরা বিশেষ করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলো আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। পরের বছর কৃষকরা স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে পারে না। এতে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হয়ে জাতীয় অর্থনীতি চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শস্যবীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সাধারণ বীমা করপোরেশন।
তবে শস্যবীমা চালুর ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছে সাধারণ বীমা করপোরেশন। এর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষকদের আর্থিক ক্ষমতার অভাব। এ প্রসঙ্গে করপোরেশন বলেছে, ‘বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে কৃষকদের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। তার ওপর দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কথা বলা বাহুল্য। তাই হাওরাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় যে পরিমাণ প্রিমিয়াম আসতে পারে, তা কৃষকদের কাছে বাড়তি বোঝা মনে হতে পারে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি হলেও কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতার অভাবে প্রিমিয়াম প্রদান ও কৃষিবীমা গ্রহণে অনীহা দেখা দিতে পারে।’
কৃষকদের আগ্রহী করতে সাধারণ বীমা করপোরেশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে সরকার হাওর এলাকার কৃষকদের বিভিন্ন উপায়ে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিয়ে থাকে। কৃষকদের বীমা গ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে সরকারিভাবে প্রিমিয়ামে ভর্তুকি দেওয়া হলে কৃষকরা প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন।
প্রকল্পের খসড়া ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, বন্যার পলি মিশ্রিত হাওর এলাকার ভূমি দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি উর্বর হওয়ায় ফসল উৎপাদনের হারও দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। বোরো ধান এ অঞ্চলের প্রধান ফসল, যা মোট ফসল উৎপাদনের ৯০ ভাগেরও বেশি। ২০১৩ সালে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার প্রভাবে এই এলাকার বোরো ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে দেশের জাতীয় ধান উৎপাদন ১৬ শতাংশ কম হয়। হাওর এলাকায় ২০০৪, ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে কৃষকের বোরো ফসল ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৭ সালে ধান কাটার ১৫-২০ দিন আগে বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ ফসল তলিয়ে যায়। আবার শীতের কারণে মৌসুমের আগেও চাষাবাদ শুরু করা যায় না। শীতে চারাগাছ মরার কারণে ব্যয় ৯০ শতাংশ বেড়ে যায়, যা কৃষকদের বহন করার ক্ষমতা থাকে না। সাধারণ বীমা করপোরেশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভূ-প্রকৃতিগত কারণে বাংলাদেশ যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশেও একটি। এ দেশের ৪৮ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান ১৫ শতাংশের বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হন। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকা হাওরবেষ্টিত হওয়ায় সেখানে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার ফলে অনেক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় শস্যবীমা থাকা আবশ্যক।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পুরো হাওর এলাকা বাধ্যতামূলকভাবে বীমার আওতায় থাকবে। সাধারণ বীমা করপোরেশন পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে প্রকল্পটি পরিচালনার চেষ্টা করছে। এ প্রকল্পে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি অধিদপ্তর, ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাকেও সম্পৃক্ত করা হবে। কৃষি ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা এ বীমার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কৃষকদের ঋণ দেওয়ার সময় ঋণের শর্ত হিসেবে বীমা করা হবে। এতে ঋণ যেমন নিরাপদ হবে, তেমনি বীমা কার্যক্রম সহজে পরিচালিত হবে। তবে যেসব কৃষক ব্যাংক ও এনজিওর ঋণে সম্পৃক্ত নয়, তাদেরকেও বীমার আওতায় আনা হবে।