চরমপন্থায় ধনীর সন্তানরা

শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডেতে গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৫৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় অপরাধী তাড়া করতে গিয়ে বিস্মিত হয়ে যান পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দেশটির রাজধানী কলম্বোর উপকণ্ঠে অভিজাত এলাকা দেমাতাগোড়ায় হামলাকারী থাকতে পারে, তা ভাবতে পারেননি তারা। হামলার ৯০ মিনিটের মধ্যে হতাহত বিপুলসংখ্যক লোককে সামলাতে যখন হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো, ঠিক সে সময়ে বাইরে বিএমডব্লিউ গাড়ি পার্ক করে রাখা একটি বাড়ি ঘিরে ফেলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এই বাড়িতেই পরিবারের সঙ্গে থাকতেন কপার কারখানার মালিক ইনসাফ ইব্রাহিম (৩৮) ও তার ভাই ইলহাম ইব্রাহিম (৩৬)। তাদের বাবা মোহামেদ ইউসুফ ইব্রাহিম দ্বীপ রাষ্ট্রটির মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী, মসলা বিক্রি করে যার ভাগ্য খুলেছে। তার দুই সন্তান জুয়েলারি ব্যবসায়ও যুক্ত ছিলেন। হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন দুজনই।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে জানানো হয়, পুলিশ ভেতরে ঢোকার পর বিস্ফোরণ হয়। বাড়িটির সবচেয়ে ওপরের তলাটি বিস্ফোরকভর্তি ছিল নাকি ইনসাফের স্ত্রী ফাতিমা সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিস্ফোরণের পরপরই নিহত হয় এ দম্পতির তিন সন্তান। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার ওই পরিবারের কর্তা ইউসুফ ইব্রাহিমকে আটকের বিষয়টি জানায় পুলিশ।

ইউসুফ পরিবারের বিষয়ে তাদের বিপরীত পাশের একটি বাড়ির বাসিন্দা সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের দেখে ভালো মানুষ হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বলেন, সন্দেহভাজন হামলাকারীরা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। তারা বাইরে পড়ালেখা করেছেন, যা ‘বিস্ময়কর’। তবে অতীতের কিছু ঘটনা সামনে আনলে উচ্চবিত্তদের চরমপন্থায় জড়ানোকে হয়তো বিক্রমাসিংহের মতো বিস্ময়কর মনে হবে না অনেকের কাছে।

১৯৭০-এর দশকে তুলনামূলকভাবে অবস্থাসম্পন্ন যুবক-যুবতীদের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউরোপে আলোচনা হয়। সে সময় জার্মানি, জাপান, ইতালি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে তরুণরা এ ধরনের তৎপরতায় জড়িয়েছিল। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে আত্মঘাতী কৌশল ছড়ানোর পর বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়। এরপর ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী তৎপরতা শুরু হয়, যাতে প্রাণ হারায় বিপুলসংখ্যক লোক।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ২০০১ সালে বিমান নিয়ে হামলাকারীদের কেউই আর্থিক সমস্যায় ছিলেন না। হামলার দায় স্বীকার করা আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নির্মাণশিল্পে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সন্তান। শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের হামলাকারী একজন লন্ডনের কিংসটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৬-০৭ সেশনের ছাত্র ছিলেন, যিনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছিলেন। পরে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যান। ক্যান্ডির চা ব্যবসায়ী ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। অন্য হামলাকারীদের মতো তিনিও আন্তর্জাতিক নামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।

ইসলামের নামে জঙ্গিবাদে জড়ানো এমন অনেকেই বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন। আল-কায়েদার বর্তমান শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত আয়মান আল-জাওয়াহিরি যোগ্যতাসম্পন্ন শিশু চিকিৎসক ছিলেন। টুইন টাওয়ারে হামলাকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের ডিগ্রি ছিল। যুক্তরাজ্যে ২০০৭ সালে একটি হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন একদল চিকিৎসাকর্মী। বাংলাদেশে গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় জড়িতদের অনেকেও ছিল অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের।