আড়াই বছর উপেক্ষিত হাইকোর্টের নির্দেশনা

শিশুর কাঁধ থেকে নামেনি বইয়ের বোঝা

সকাল ৯টা। বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল তিশা। রাজধানীর আগারগাঁও তালতলার লায়ন্স অগ্রগতি শিক্ষা নিকেতনের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। কাঁধে ভারী ব্যাগ। একপাশে কাত হয়ে পড়েছে শরীরটা। তিশা বলে, ‘অনেক বই। ব্যাগ নিতে খুব কষ্ট হয়। যখন কাঁধে ব্যথা পাই তখন আম্মুর কাছে দিয়ে দেই। বই না নিলে ক্লাসে পড়া ভালো বোঝা যায় না। ব্যাগে বই ছাড়াও অনেক খাতা থাকে। মাঝে মাঝে টিফিনও নিতে হয়।’ তিশার মা বলেন, ‘সব বিষয়েরই বই নিতে হয়। এজন্য স্কুলব্যাগের ওজন বেড়ে যায়। বইয়ের সঙ্গে প্রত্যেকটি বিষয়ের একটি করে খাতাও নিতে হয়। এর সঙ্গে নিতে হয় ডায়েরি, বাসার কাজের খাতা, জ্যামিতি বক্স, টিফিন বক্স ও পানি। এত বই-খাতা। ব্যাগ তো ভারী হবেই।’

মিরপুর-১২ নম্বরের প্রধান সড়কের পাশে দেখা হলো তাহসিনের সঙ্গে। সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। কাঁধের ব্যাগে সব মিলিয়ে ছয়টি বই। সঙ্গে আরও আট-দশটি খাতা ও অন্যান্য সামগ্রী। এত ভারী ব্যাগ!, কষ্ট হয় না?Ñ জানতে চাইলে তাহসিনের মা বললেন, ‘ওর (তাহসিনের) ওজন ১৫-১৬ কেজি, সেখানে ওর স্কুল ব্যাগের ওজনই সাড়ে তিন থেকে চার কেজি।’

শুধু তিশা বা তাহসিনই নয়, কাঁধে ভারী স্কুলব্যাগ নিয়ে কিছুটা কাত হয়ে কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার এ দৃশ্য রাজধানীর সড়কগুলোর প্রতিদিনকার স্বাভাবিক চিত্র। ঘুম থেকে উঠে নিজের ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের ব্যাগ কাঁধে-পিঠে নিয়ে শিশুদের ছুটতে হচ্ছে বিদ্যালয়ে। শুধু সরকারের দেওয়া বই-ই নয়, সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে দেওয়া সহায়ক বই এবং প্রতিটি বিষয়ের বিপরীতে সর্বোচ্চ তিনটি পর্যন্ত খাতা বা ডায়েরি নিতে হচ্ছে ব্যাগে। সঙ্গে জ্যামিতি বক্স, টিফিন বক্স ও পানির পাত্র। একসঙ্গে এতসব নিয়ে কাঁধে-পিঠে চাপানো ব্যাগে ঝুঁকে পড়ছে শিশুদের শরীর। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে চোখমুখ। কিন্তু মুখ ফুটে তা প্রকাশ করতে পারছে না। নিতান্তই নিরুপায় হলে ব্যাগটি তুলে দিচ্ছে সঙ্গে থাকা পরিবারের কোনো সদস্যের কাছে। গত সপ্তাহে রাজধানীর লায়ন্স অগ্রগতি শিক্ষা নিকেতন, সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, ধানম-ি বয়েজ হাই স্কুল, ধানমণ্ডি টিউটোরিয়াল, মিরপুরের লতিফ মেমোরিয়াল স্কুল এবং ফুলার রোডের উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশপাশ ঘুরে এমন চিত্র দেখতে পান এই প্রতিবেদক।

অথচ ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টের এক রায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন বন্ধের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে বলেছিল। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের আগে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে বলা হয়। আর প্রজ্ঞাপনটি রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই জারি করতে বলা হয়েছিল। রায়ে আইন সচিব, শিক্ষা সচিব ও গণশিক্ষা সচিবসহ বিবাদীদের আইন প্রণয়ন এবং গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও শিক্ষা সচিবকে আইনটি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, গত আড়াই বছরেও এই আইনটি প্রণয়ন হয়নি। এমনকি যে শিক্ষা আইনের একটি ধারায় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা রাখার কথা ছিল, সেই আইনটিও আর হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের এনসিটিবি নির্ধারিত যে বই দেওয়া হয় তা কিন্তু সংখ্যা ও ওজনে খুবই কম। স্কুলের শিক্ষকরা মাঝে মধ্যে এই বইয়ের সঙ্গে বাড়তি বই চাপিয়ে দেওয়ার কারণে ব্যাগ ভারী হয়ে যায়। তবে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর আমরা সব প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওই নির্দেশনাটি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মাঠপর্যায়ের সব শিক্ষা কর্মকর্তাকেও নির্দেশনা দেওয়া হয় এ বিষয়ে তদারকির জন্য। সেভাবেই চলছে। এখন সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ভারী বই বহন করতে হয় না।’

তবে কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলো সরকারের অনুমতি ছাড়াই চলে জানিয়ে আকরাম-আল-হোসেন আরও বলেন, ‘এসব স্কুলে বাড়তি বইয়ের সংখ্যা বেশি থাকে। যেহেতু সেগুলো অনুমতি না নিয়েই চলে, ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদারকি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

শিশুদের ভারী ব্যাগ বহন নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিশুদের শরীরের ১০ শতাংশের বেশি ভারী ব্যাগ বহন নিষেধ সম্পর্কে বিভিন্ন স্কুলকে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে এবং বাকি স্কুলগুলোকে জানানোর প্রস্তুতি চলছে। আশা করি দ্রুতই শিশুদের ভারী ব্যাগ বহন বন্ধ হবে। তবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরও যদি কোনো স্কুলে শিশুদের মাত্রাতিরিক্ত ভারী ব্যাগ বহন করতে দেখা যায় বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোনো ধরনের অবহেলা দেখা যায় তাহলে আদালত তাদের প্রতি আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

শিশুদের ভারী ব্যাগ বহন নিয়ে চিন্তিত শিক্ষক-অভিভাবকরাও। রাজধানীর আগারগাঁও তালতলায় লায়ন্স অগ্রগতি শিক্ষা নিকেতনের সহকারী প্রধান শিক্ষক ওবায়দুল কবীর মুরাদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এই বয়সে এত ভারী ব্যাগ বহন করা ঠিক নয়। আশা করি, আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে শিশুদের এই ভারী ব্যাগ আর বহন করতে হবে না। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও অনলাইনের মাধ্যমে স্কুলে পড়ানো হবে।’

শিশুদের ভারী ব্যাগ বহনে সতর্ক করলেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং শিশু সংগঠন খেলাঘরের সভাপতিম-লীর সদস্য লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শিশুদের ভারী জিনিস বহন করার একটা স্বাভাবিক মাত্রা আছে। মাত্রাতিরিক্ত কোনো জিনিস বহনে কাঁধের মাংসপেশির ওপর চাপ পড়ে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। পরবর্তী সময়ে মেরুদণ্ড, কোমর ও কাঁধে ব্যথা অনুভূত হয় এবং এই ব্যথার কারণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। আর এই মানসিক চাপে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে শিশুরা।’’]